___মেঘ, রোদ বৃষ্টি____
by নাঈম আমান

১ বাতিটির চারপাশে একঝাঁক পোকা ঘুরে ঘুরে উড়ছে । আলোর প্রতি তীব্র আকর্ষণে বার বার ছুটে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে । তারপর আবার ঘুরে ঘুরে উড়ে ঘিয়ে ধাক্কা খাওয়া । অদ্ভুত এক চক্র । মিটমিট করে জ্বলতে থাকা বাতিটির আলো গলির এ মাথায় প্রায় আসছে না বললেই চলে । সেখানে রঞ্জু দাঁড়িয়ে আছে । হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনের ওঠানামা দেখে বোঝা যায় সেখানে কেউ আছে । এই মুহুর্তে রঞ্জুর খুব অস্বস্তি হচ্ছে । ঘামে ভিজে যাওয়া শার্টটা পিঠের সাথে লেগে থেকে অস্বস্তিটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে । এখন বাজে প্রায় সোয়া ১২টা । সে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে ১১টা ৩৭ এ । এই আধ ঘন্টার মধ্যে সে ৪ টা সিগারেট পুড়িয়েছে । এখন ৫ নাম্বার টা জ্বলছে । বড্ড পানির তেষ্টা পেয়েছে কিন্তু এখান থেকে সরার উপায় নেই । রাস্তা থেকে কেউ দেখে ফেললে সন্দেহ করবে । গলির কোণে পড়ে থাকা আবর্জনা থেকে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে । বমি বমি লাগছে । বমি ভাবটা দূর করতে কষে কয়েকটা টান লাগিয়ে ছুড়ে ফেললো সিগারেটটা । চলে যাবে নাকি ? না, আরো কিছুক্ষন দেখা যাক । ঘড়ি দেখলো সে । ১২টা উনিশ । আরেকটা সিগারেট ধরালো । রিঙ্কি বোধহয় এখনো খাবার নিয়ে জেগে বসে আছে । ভাইয়া ঘরে না ফেরা পর্যন্ত খাবার মুখে তুলবে না সে । যতো রাতই হোক, বসে থাকবে । গত সপ্তাহে দুশো টাকা চেয়েছিলো । কোন বান্ধবীর নাকি জন্মদিন ছিলো, সেখানে যাওয়ার কথা । দেয়া হয়নি । কোত্থেকে দিবে ? গত ৭ মাস ধরে ঘুরেও একটা চাকরীর ব্যবস্থা করতে পারেনি । কতোগুলো ইন্টারভিউ দিয়েছে ইয়ত্তা নেই । প্রত্যেকটা ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে, তবু আর ডাক এলো না । সংসারের অবস্থা তেমন একটা ভালো না । বাবার পেনশনের টাকায় কোনোরকম চলছে । তারপরেও গত মাসে চলার জন্য মার একজোড়া বালা বিক্রি করে দিতে হয়েছে । কিছুদিন পর রিঙ্কির এসএসসি পরীক্ষা । ফী বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়েছে । এভাবে আর কতোদিন ? কিছু একটা তো করতেই হবে, নইলে দুদিন পর থেকে না খেয়ে থাকতে হবে । আবার ঘড়ি দেখলো রঞ্জু । ১২টা ৪৩ । নাহ, আর দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয়না । এত রাতে আর কেউ আসবে বলে মনে হয়না । সিগারেটে পর পর কয়েকটা টান দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলো । গলি থেকে বেড়িয়ে ডানে বায়ে একবার চোখ বুলালো । বা-দিক থেকে মধ্যবয়স্ক একটা লোক হেটে আসছেন । হাটার ভঙ্গিতে কেমন একটা ক্লান্ত ভাব । ডান হাতটা পকেটের ভেতর । এই গরমের মধ্যে পকেটে হাত গুজে রাখার মানে কি ? পকেটে নিশ্চয়ই...... আবার গলির ভেতর ঢুকে পড়লো রঞ্জু । তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে রুমালটা বের করে মুখটা বেধে নিলো । চোখগুলো শুধু দেখা যাচ্ছে । বা-চোখের পাঁতাটা তিরতির করে কাপছে । কপাল থেকে এক ফোটা ঘাম গড়িয়ে পড়লো চোখের ওপর ।

২ বড্ড দেরী হয়ে গেলো । আজমল সাহেবের বাড়ি ফিরতে কখনও এত দেরী হয়না । প্রায় একটা বাজে । ইদ্রিস চৌধূরী পাক্কা ৩ ঘন্টা বসিয়ে রাখলেন । বড়লোক মানুষ, মুখের উপর কিছু বলাও যায়না । অবশ্য তিনিও একটু দেরী করেই গিয়েছেন । যাওয়ার কথা ছিলো আটটায় তিনি পৌছুলেন সাড়ে আটটায় কিছু পরে । দোষ তো আর তার নিজের না । পকেটে টাকা ছিলো না, গাড়িতে আসতে পারেন নি । হেটে হেটে এসেছেন । দেরী হয়ে গেছে । তাই বলে এতক্ষন বসিয়ে রাখবেন ! এরা সারাজীবন নিজের মুল্য বাড়াতে ব্যস্ত ছিলেন, তাই মানুষের মুল্য দিতে শেখেননি । ইদ্রিস চৌধুরী হলেন আজমল সাহেবের স্ত্রী আফসানা বেগমের দূর সম্পর্কের মামাতো ভাই । সেই সূত্র ধরেই আজকে কিছু টাকা ধার করতে যাওয়া । আফসানার মতে বিপদের সময় কাছে দূরের সম্পর্ক দেখতে হয়না । যেদিকে সাহায্যের সম্ভাবনা আছে সেদিকেই ছুটে যাওয়া উচিৎ । ছুটে গিয়ে ক্ষতি হয়নি । হাজার পাঁচেক টাকা পাওয়া গেছে । কিছুদিনের জন্য নিশ্চিন্ত । দোকান বাকীগুলো মিটিয়ে দেয়া যাবে । মাস শেষ হতে এখনো ৬ দিন বাকি । এর মধ্যেই ঘরের রসদ শেষ হয়ে গেছে । আগের টাকা শোধ না করলে দোকানদাররাও আর বাকি দিবেনা বলে দিয়েছে । গতকাল শরীফ মিয়ার দোকান থেকে চাল ডাল আনতে গিয়েছিলেন । চাল ডাল ওজন করে হাতে দেয়ার সময় শরীফ মিয়া এমন ভাবে তাকিয়ে ছিলো যেন তিনি একটা ডাস্টবিনের নোংরা কীট । তারপর পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হেসে বলেছে, "চাচা মিয়া, আগের কিছু টেকা পাওনা ছিলাম । ওইগুলান না শোধাইলে তো আর বাকি দেওন যাইবো না ।" এতগুলো মানুষের সামনে লজ্জায় তিনি কিছু বলতেও পারেন নি । মাথা নিচু করে চলে এসেছেন । কালকে টাকাটা শোধ করে দেয়া যাবে । সাড়ে বারোটার কিছু বেশি বাজে । বেশ ক্ষুধা পেয়েছে । ইদ্রিস চৌধুরীর বাড়িতে তিন ঘন্টা বসিয়ে রেখে তাকে শুধু এক কাপ চা দেয়া হয়েছে । চা-টা তিনি বেশ তৃপ্তি করে খেয়েছেন । এখন মনে হচ্ছে চা খাওয়াটা ঠিক হয়নি । তলপেটে চাপ দিচ্ছে । খালি করতে হবে । রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রসাব করাটা কি ঠিক হবে ? সাথে আবার এতগুলো টাকা ! পকেট থেকে তো হাতটাই বের করতে ইচ্ছে করছে না । কিন্তু হালকা না হলেও তো চলছে না ! আরো অনেকটা রাস্তা হেটে যেতে হবে । কোনো রিক্সাও নেই । থাকলেও লাভ হতো না, ধারের টাকা খরচ করে রিক্সায় চরার মতো বিলাসিতা করা সাজে না । এখন মনে হচ্ছে পেটটা বুঝি ফেটে যাবে । আর সহ্য করা সম্ভব না । আজমল সাহেব পেট খালি করার জন্য ডান দিকের একটা চিপা গলিতে ঢুকলেন । গলির শেষ মাথা একটা হলুদ বাতি টিমটিম করে জ্বলছে । আজমল সাহেব ডান হাতটা পকেট থেকে বের করলেন । কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে । টাকার ওপর হাত রাখলে কেমন স্বস্তি লাগে । টাকার বোধহয় আলাদা একটা গরম আছে । আরামদায়ক উষ্ণতা । শরীরটা গরম গরম লাগে । আজমল সাহেব প্যান্টের চেইন লাগিয়ে ঘুরে দাড়াতেই চমকে উঠলেন । তার সামনে মাঝারী আকৃতির একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে । কোনো এক অদ্ভুত কারনে তার মুখটা রুমাল দিয়ে বাধা । গলিতে ঢোকার সময় তো তিনি কাউকে দেখেননি । লোকটা কি তার পিছু পিছু এসেছে ? অস্পষ্ট আলোতেও তিনি আশ্চোর্যজনক স্পষ্টভাবে দেখলেন লোকটির হাতে একটি চকচকে ছুরি বেড়িয়ে এলো । হঠাৎ তিনি সম্পুর্ন ঘটনা বুঝতে পারলেন । তীব্র আতঙ্কে তার গা গুলাতে লাগলো । তাকে এখন ছিনতাই করা হবে ! ধার করে আনা পাঁচ হাজার টাকা এখনই হাতছাড়া হয়ে যাবে । সেই সাথে হয়তো জীবনটাও । ; সাথে যা কিছু আছে বের করুন । আজমল সাহেব কোনো কথা বললেন না । ডান-হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে টাকাগুলো চেপে ধরে রইলেন । লোকটা তাকে ধাক্কা দেয়ালে ঠেকিয়ে ধরলো । একটু আগে তিনি এই দেয়ালেই পেট খালি করেছেন । ছুরিটা তার গলায় চেপে বসলো । ফল কাটার ছুরি কেনো ?! ছিন্তাইকারীরা তো রামকুড়ি নামের এক ধরনের চাকু ব্যবহার করে । হাতলের ভেতর ফলাটা লুকানো থাকে, সুইচ টিপলেই বেড়িয়ে আসে । মাথাটাও একটু বাঁকানো থাকে বোধহয় । তবে এটা ফল কাটার ছুরি হলেও বেশ ধারালো । গলায় কেটে বসছে । লোকটা আজমল সাহেবের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলো । জোর করে তার হাত বের করে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিলো । আজমল সাহেব হঠাৎ হড়হড় করে বমি করে দিলেন । বমিতে লোক্টার গা মাখামাখি হয়ে গেলো । সে আজমল সাহেব কে ধাক্কা মেরে দৌড়ে গলি থেকে বেড়িয়ে গেলো । আজমল সাহেব চিত হয়ে ময়লার ওপর পড়লেন ।

৩ রঞ্জু দৌড়াচ্ছে । ঠিক মতো পা ফেলতে পারছে না । ভয়ে তার পা কাপছে । সে এইমাত্র একটা ছিনতাই করেছে । এমবিএ কমপ্লিট করে সে ছিনতাই বিদ্যা শিখেছে । ফল কাটার ছুরি দিয়ে ছিনতাই !

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top