by- মোরশেদা কাইয়ুমী।

তিতু শুনে যা তো মা ,কই গেলি?
ডাক শুনে পরনের শাড়িটা এক টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে পড়ি মরি করে দৌঁড় লাগায় মুনা।যাওয়ার পথে হুমড়ি খেয়ে পড়ায় হোহো করে হেসে উঠে সুজয়।বলে
>যা তুতু !মাড় খেতে ডাকছে তোকে !হিহিহি!
শাড়ি পরে খেলছিলো ওরা কয়জন পিচ্চির দল। সুজয় এখন আর তাদের সাথে খেলেনা ,সারাক্ষণ ক্রিকেট নিয়েই পড়ে থাকে। আর সুযোগ পেলেই মুনাকে ক্ষেপায় আয় তুতু বলে ।
মা টা যে কি! রাগ লাগে মুনার। তার পুরা নাম মায়মুনা চৌধুরী হলেও মা ডাকে তিতু বাবা ডাকে মিনি। সুজিটাও তাকে এই নিয়ে ক্ষেপাতে ছাড়েনা। কখনো আয় তুতু বলে আবার কখনো চু চু মিনি মিনি বলে ক্ষেপায় ।বলে তোর এত সুন্দর নাম থাকতে তোর আম্মু আব্বু কুত্তা বিলাইর নাম ধরে ডাকলে আমি ডাকলে ক্ষতি কি?
তিতু ও কম যায়না ,তাকে সুজির হালুয়া ডাকে, সাথে বান্দর ডাকটা ফ্রি। তবে মাঝে মাঝে বেশি রাগলে সামনে যা পায় ছুঁড়ে মারে বান্দরটাকে। বাকি সবাই মুনাই ডাকে ওকে। বাবা মা টা বললেও শুনেনা ,একমাত্র মেয়ে বলে খুব বেশিই আদর করে। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে। বাড়ির পিচ্চিরা যখন কাদায় লাফালাফি করে, পুকুরে লাফঝাঁফ দিয়ে সাঁতার কাটে তখন তাকে পাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মত দেখতে হয় ।অনুমতি নেই তার এসব কিছুর


সুজয় তাকে ভেংছি কেটে বলে বিলাই কুত্তা তো এমনিতেই সাঁতার পারেনা। তুই পারবি কেমনে,থাক আর কাঁদিসনা তুতু!
রাগে মুনা পুকুরের পাড় থেকে ঢিল ছুঁড়ে মারে। চিত্কার করে বলে দেখিস সুজি একদিন আমিও সাঁতার কাটা শিখবো। আমিও ডুবসাঁতার দিয়ে মাটি ছুঁয়ে আসবো। আমি জলপরী হবো ।
সুজয় ঢিল ছোঁড়ার সাথে সাথেই ডুব দেয় বলে শেষের কথাটা ওর কানে যায় কিনা বোঝা যায়না।
চৌধুরী সাহেবের একমাত্র মেয়ে বলে বাড়াবাড়ি রকমের আদর শাসনে মুনার শৈশব জীবনটা এমনই অতিষ্ঠ হয়ে যায়। যা কিনা গ্রামের আট দশটা শিশু থেকে অনেকটাই ব্যাতিক্রম। তার আকাশটা খুব ছোট ,চাইলে যখন খুশি,যেখানে খুশি উড়তে পারেনা। আব্বু আসলেতো কথাই নেই সারাক্ষণ মিনি মিনি করে ডাকতে থাকে। বই নিয়ে বসে থাকতে হয়। কত কি যে নিয়ে আসে মুনার জন্য ।কিন্তু মুনা কি করে বুঝায় যে ওর এসবের চেয়ে ওর কাছে গ্রামের পিচ্চিদের মত ছোটাছুটি করে বৃষ্টিতে ভিজতে,কাদা মাখামাখি করে সাঁতার কাটতেই ভালো লাগে। ও কি করে পারবে সাঁতার শিখতে? ওর যে জলপরী হতে ইচ্ছে করে। যাকে পুকুরে গোসল করতেই দেয়া হয়না সে কি করে সাঁতার শিখবে? কি করেইবা জলপরী হয়ে জলে খেলা করবে?
মুনা মনখারাপের খাতাটা খুলে বসে ইচ্ছে মত জলপরীর ছবি আঁকে মন দিয়ে। খাতাটা সে কাউকেই দেখায়না ।

ইচ্ছে করে খুব বন্ধুদের দেখাতে কন্তু ঐ পাজি সুজিটার জন্য পারেনা। ও ঠিকই ওকে এটা নিয়ে ক্ষেপাবে ,ওফ্ বান্দরটা কেন যে এমন করে।
মুনা এইবারের সমাপনি পরীক্ষার্থী বলে পড়ার চাপটাও খুব বেশি দেয় বাবা মা। চৌধুরীর মেয়েকে যে বৃত্তি পাওয়া ছাড়া উপায় নাই এটা ওকে দিনরাত বুঝানো হয় ।ও হাঁফিয়ে উঠে ।ইচ্ছে করে পিংকি সুজয় শিহাবদের সাথে ইচ্ছেমত প্রজাপতির হয়ে উড়ে বেড়াতে।
>তিতু কি করিস চুপচাপ? পড়ার শব্দ পাইনা কেন? এই নে দুধটা খেয়ে নে।
মা আসতেই মুনা মন খারাপের খাতাটা লুকিয়ে রাখে বইয়ের নিচে ।মা দেখলেই বকা দিবে খুব ।হয়তো ছিঁড়েও ফেলতে পারে,না পড়ে এসব আঁকছে বলে।
>আচ্ছা মা তুমি আমাকে তিতু ডাকো কেন? আমাকে কি তিতা লাগে তোমার?
মেয়ের অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে হেসে উঠে শারমিন সুলতানা। এক কালের তুখোড় মেধাবী ছাত্রী ,আর পাড়ার শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় নিজের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা অংকুরেই মরে গিয়েছিলো। আরমান চৌধুরী বিয়ের পর শারমীন কে পড়াবে বলে কথা দিলেও মায়ের জন্য পারেনি। তার বড্ড শখ ছিলো তিতির পাখি মত রঙীন স্বপ্নময় জীবনের। নিজে যা পারেননি মেয়ের চোখে সেই নিজেকে খুঁজে নেন। এখন থেকেই স্বপ্ন পূরণের ভিত টা গড়ে দিতেই তার এই আপ্রাণ চেষ্টা।
>কিছু বলছোনা কেন আম্মু?
শারমীন কে চুপ করে ভাবতে দেখে মুনা বলে উঠে।
>তুই যে আমার তিতির পাখি, তাই তোকে আদর করে তিতু ডাকি ।কেন তোর পছন্ধ না?
>তিতির পাখি? মুনা অবাক হয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠে।
তবে যে সুজি এমন করে বলে?
>সুজিটা কে? সুজয়? ছি মা এভাবে বলতে হয়না। ও মজা করে আর কি তোর সাথে।
>আচ্ছা মা তিতির পাখি কি উড়তে পারে?
>পাখি যখন উড়তেইতো পারার কথা তাইনা? শারমীন উদাস কন্ঠে বলে উঠে।
আস্তে করে মেয়ের চুলে বিলি কেটে দিয়ে উঠে পড়েন। এখানে থাকলে এখন বিচ্ছুটার হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। যার অধিকাংশই তার জানা নেই। কি করে থাকবে ?পড়া শুনার তেমন সুযোগ কি পেয়েছেন তিনি? তবে মেয়েটা তার খুবই মেধাবী। একটু গার্ড দিতে পারলে খুব ভালো রেজাল্ট করবে।
মা চলে আসতে মুনা আবারো ছবি আঁকতে শুরু করে, তার না দেখা তিতির পাখিটা আঁকে। অনেকটা হাঁসের বাচ্চার মত হয়ে যায়। ইস্ ওর যদি একটা তিতির পাখি থাকতো।
জলপরী থেকে এইবার তিতির পাখি হতে ইচ্ছে করে ওর। আবার ভাবে চাইলেও কি সে উড়তে পারবে? কিন্তু সাঁতারটা শিখতে তো চাইলেই পারা যায়। যদিনা মা রাজি হয়।
পরদিন আরমান চৌধুরী আসলে মুনা গলা জড়িয়ে এক জোড়া হাঁসের বাচ্চা চায়। মেয়ের আবদার খুব একটা ফেলতে পারেননা তিনি। শারমীনের বকাবকি সত্বেও পরদিন তুলতুলে
এক জোড়া হাসের বাচ্চা এসে তার আদরের মিনির হাতে তুলে দেন।
>দেখো আম্মিনি এগুলো নিয়ে কিন্তু বেশিক্ষণ থাকা চলবেনা। পড়া শুনা করতে হবে ঠিকমত। আমার মিনিটাকে যে অনেক বড় ডাক্তার হতে হবে। বলেই মেয়েকে আদর করে বেরিয়ে যান তিনি।
মেয়ের খুশি দেখে তার মনটা ভরে যায়।
মুনা ওদেরকে দুহাতে কোলে তুলে নিয়ে বলে
>আম্মু হাঁসবাবুদের গোসল করাই?
>না,লাগবেনা। আমি করাবো দুপুরে, তুই যা গোসল করে স্কুলে।
মুনা মুখটা কালো করে বাথরুমে গোসল করতে ঢুকে। ওকে পুকুরে গোসল করে দেয়া হয়না,গ্রামে থেকেও তার শহুরে জীবন ভালো লাগেনা। মা কেন বুঝেনা তার ও সাঁতার কাটতে ইচ্ছে করে ওদের মত। পুকুরে না নামলে যে সাঁতার শিখতে পারবেনা এটাও বুঝেনা মা ।বড়রা এত বোকা হয় কেন?
শারমিন নিজেও পুকুরে করেননা খুব একটা ।মোটর দিয়ে পানি তুলে বাথরুমেই করে নেন।মেয়ে হওয়ার পরই এটার ব্যাবস্থা করেছে চৌধুরী। তার পিচ্চি পরীটা পুকুরে নামা শিখে গেলে কখন কি হয়ে যায়, খুব ভয় তার। পুকুরের চারপাশেও বাঁশের বেড়া দিয়েছিলেন তখন মেয়ের জন্য। মুনা ছোট থেকে খুব বেশি চঞ্চল ছিলো। অবশ্য এখন খুব বেশি শান্ত আর লক্ষি হয়ে গেছে। তাও একটি মাত্র মেয়ে বলে সবসময় চোখে চোখে রাখা ।
ঝুম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভিজতে ভিজতে মনের আনন্দে স্কুল থেকে বাড়ি আসে মুনা। শারমীন ইচ্ছে মত বকা দেয়। এদিকে হাঁসের বাচ্চারা বৃষ্টিতে উঠোনে ছোটা ছুটি করতে থাকে। ওদেরতে কিছুতে ধরতে না পেরে মুনাকে বলে ধরে দিতে। শারমিন শ্বাশুড়ির ডাকে ভেতরে চলে গেলে মুনা পিচ্চিদের নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ওদেরকে ধরে। কাদায় মাখামাখি হাঁসের ছানাদুটো নিয়ে পুকুরে যায় মুনা। দুহাতের মুঠোয় দুটা নিয়ে পরিস্কার করতে গিয়ে একটা ছুটে পালায় পুকুরে! মুনার বড্ড হিংসে হয়। এই পিচ্চি ছানাটা এমন করে কি করে সাঁতার শিখলো? কে শেখালো ওকে?ইস্ ওর আম্মুটা কত্ত ভালো! একটু বকা দেয়নি ,সাঁতার শিখিয়ে দিয়েছে।
এইরে আম্মু জানলেতো হাড্ডি ভাঙ্গবে! ও পুকুরে এসেছে না বলে। কিন্তু ওটাকে না নিয়ে কি করে যাবে ও? হাঁসের ছানাটাকে কাকুতি মিনতি করে ডাকতে থাকে মুনা
আয়না বাবুছানা আয় প্লিজ।
হাঁসের ছানাটা কতটা কি বুঝে কে জানে। ও কিছুটা নাগালের মধ্যে চলে আসে মুনার। মুনা একটুখানি ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে ধরতে যায়।
>মিনি মিনি, কই গেলি আম্মুনি ।দেখ তোর হাঁসবাবুদের জন্য বাসা এনেছি।
চৌধুরী বাজার থেকে এসেই হাকডাক শুরু করে।
>এই করে করে তুমি মেয়েটাকে মাথায় তুলেছো। মেয়েটার সমাপনি পরীক্ষা, এইসব নিয়ে মেতে থাকলে চলবে?শারমিন রাগে গজ গজ করতে থাকে ।
>আহ্ বাদ দাওতো ,কিচ্ছু হবেনা দেখো। আমার মিনিটা ঠিক সবার চেয়ে ভালো রেজাল্ট করবে। কিন্তু ওকে দেখছিনা কেন?এই সন্ধ্যায় বৃষ্টির মধ্য ওকে আবার কোথায় পাঠালে?
>আমি আবার কোথায় পাঠাবো? ওতো আজ ভিজে ভিজে এসেছে স্কুল থেকে। ছাতা নেয়নি ইচ্ছে করে। তোমার মেয়েটা দিনদিন কি যে হচ্ছে। বললাম হাঁসের ছানাদুটো ধরে আনতে।কিন্তু ওগুলো নিয়ে গেলো কোথায় ?
আরমান সাহেব লাফিয়ে উঠেন
>কি বলছো? কোথায় গেছে ও? মিনি মিনি, আম্মিনি কই তুই?
সারা বাড়ি প্রতিটি ঘর খোঁজা হলো কোথাও নেই তার মিনি ।পিচ্চিরা জানালো ওরা হাঁসের ছানাদুটো নিয়ে মুনাকে চলে যেতে দেখেছে। ওরা যে যার ঘরে চলে গেছে ।
মূহূর্তে সারা পাড়া খবর হয়ে গেলো । নাহ্ কোথাও যায়না তেমন একটা ও। কিন্তু এখন ভেজা গায়ে কোথায় গেল?
সবাই খুঁজতে লাগলো পাগলের মত । শারমীন পুকুর ঘাট থেকে চিত্কার দিয়ে জানালো হাঁসের ছানা দুটো পুকুরে সাঁতার কাটছে।
>মিনি কই?আমার মিনি কোথায় গেল?ওতো সাঁতার জানেনা যে পুকুরে নামবে।
একটু পর আরেকটা ছেলে সহ পুকুরে নামলেন তিনি। ডুব দিয়ে খুঁজে না পেয়ে পরে লম্বা বাঁশ দিয়ে খুঁজতে লাগলো কয়েকজন।
এই করে প্রায় বিশ মিনিট পর আরমান সাহেবের বাঁশের সাথে কিছু একটা কাপড় আটকে গেল!
সাথে সাথে তার চোখ মুখের ভাষা পাল্টে গেলো। মুখোমুখি আরেকটা ছেলে বুঝতে পারলো ব্যাপারটা । সাথে সাথে ডুব দিলো সে। ডুব দিলেন আরমান সাহেব ও। তার আদরের মিনিটা উপুড় হয়ে দুহাতে মাটি আঁকড়ে ধরে আছে। যেন সে উড়তেছে দুহাত মেলে। উঠিয়ে আনলেন অসাঢ় হয়ে থাকা ধবধবে সাদা জলপরীটাকে।
সুজয়ের কানে বাজতেছিলো মুনার কথাগুলো।
"দেখিস আমিও একদিন ডুবসাঁতার শিখবো। জলপরী হয়ে পানিতে ডুব দিয়ে বসে থাকবো।"
সুজয়ের মনে হয় মুনা সত্যি সত্যি জলপরী হয়ে গেছে। ওর উপর রাগ করেই কি মুনা জলপরী হয়ে গেল?
সুজয়ের চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টির পানি আর কান্নার জল মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। কান্নার কি কোন রং থাকে আলাদা করার জন্য?
 
Top