by: মাহমুদ হাসান



২২ বছর ৪ মাস ১৩ দিন বয়স পর্যন্ত আমার জীবনের অভিধানে ‘হতাশা’ নামক কোন শব্দ ছিল না। কিন্তু এরপরের দিনগুলো পুরো পাল্টে গেছে। এখন আমার জীবনের অভিধানের প্রতিটি পাতায় একটাই শব্দ ‘হতাশা’... নিজেকে খুব পজিটিভ মানসিকতারই ভাবতাম। শুধু আমি না, আশেপাশের মানুষও আমাকে তাই বলে। আমি বিশ্বাস করতাম প্রত্যেকটা ঘটনার পেছনে নেগেটিভের সাথে কিছু পজিটিভ ব্যাপার থাকে। আমি যেভাবেই হোক অতি দক্ষতার সাথে সেই পজিটিভ ব্যাপারটা বের করে ফেলতে পারতাম। সোজা কথায় বললে সবকিছু সহজ করে ভাবতে পারতাম। তাই হতাশা আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না। ছোট্ট একটা উদাহরন দেই। এসএসসিতে আমি ৮৮২নম্বর পেয়েছিলাম আর এইচএসসিতে পেয়েছিলাম ৭৮৮। সেই আমি ভালো কোথাও চান্স পাইনি। এরপরে কুমিল্লার একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়ে সিএসইতে ভর্তি হয়েছিলাম। মাত্র আড়াই মাস ক্লাস করার পর সেই ভার্সিটিটাই উধাও হয়ে গেলো। তারপরও ভেঙ্গে পড়িনি। ভাবলাম আর পড়াশুনা করব না। বাবার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে বুটিক শপ দিলাম। অনভিজ্ঞতার জন্য পুরো টাকাটাই লোকসান হয়ে গেলো।



এতো কিছুর পরও হতাশা আমাকে ছুঁতে পারলো না।
বাবার হাসিখুশী মুখটা ফটোকপি করেই বোধহয় এই পৃথিবীতে এসেছি। আমার এই হাসিমুখটাই আমাকে আরেকটা হাসিখুশি পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছিল। আমার এই পৃথিবীটা হচ্ছে নিনা, যার ঠোঁটে সবসময়ই একটুকরো টোল-ভাঙ্গা হাসি ঝুলেই থাকে। ওর সাথে পরিচয় হয়েছিলো সিলেটের জাফলং এ গিয়ে। নিনারা এসেছিলো ৩২ জনের বিশাল এক ফ্যামিলি ট্রিপে। আমি আর আপু গিয়েছিলাম দুলাভাইয়ের সাথে। জাফলং যাবার পথে ঘটনাক্রমে আমরা বিআরটিসির একি বাসে ছিলাম। দুলাভাই বেশ মিশুক মানুষ। নিনার ফ্যামিলির সাথে পরিচিত হতে সময় নিলেন না। সেইসময় ডিজিটাল ক্যামেরার অতো প্রচলন ছিল না। আমাদের সাথে দুটি ফিল্ম ছিল। জাফলং যাবার পর ঘণ্টাখানেক পর নিনাদের ফিল্ম ফুরিয়ে গেল। আমার দুলাভাই দাতা হাতেম তাইয়ের মতই একটা ফিল্ম ওদের দিয়ে দিলেন। এই নিয়ে আপু রাগারাগি করলেও ভাইয়া সেটা গায়ে মাখলেন না। সেই ফিল্মের সুত্র ধরেই দুটি পরিবার একসাথে বেশ কিছু ছবি তুলল। এই ছবি তুলতে গিয়েই নিনার সাথে আমার পরিচয়। একটা মেয়ে এতো সুন্দর করে হাসতে পারে আমার জানা ছিল না। প্রথম দেখাতেই কিন্তু আমি নিনার প্রেমে পড়িনি।এই ঘটনার প্রায় দুমাস পর নিনা দুলাভাইর ঠিকানায় আমাদের ছবিগুলো ওয়াশ করে পাঠায়। এর এক সপ্তাহ পর আমাদের টেলিফোনে নিনার কল পেয়ে আমি ভীষণ অবাক হলাম। আমাদের বাসার টেলিফোন নম্বর ওকে দেইনি। পরে জানলাম সে দুলাভাইয়ের কাছ থেকে আমার নম্বর নিয়েছে। ওর সাহস দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না।





এরপর প্রায়ই ফোনে কথা হত। আমার জন্মদিনের দিন ওর পাঠানো গিফটকার্ড পেলাম। কিন্তু এর সাথে যা দেখলাম তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। জাফলং এ আমার আর নিনার একসাথে ছবি। আমার অজান্তেই কোন এক ফাঁকে এই ছবি তোলা হয়েছিলো। চমকের তখনো অনেক বাকি ছিল। ছবির অপর পাশে সুন্দর হাতে লেখা... ছবিটা কিন্তু আমার মনের কথা বলে, জানিনা তোমার মনও একই কথা বলে কিনা। একটা মুহূর্তও অপেক্ষা না করে তখনি ওকে হ্যাঁ বলে দিলাম। এরপরের গল্পটা আর দশটা প্রেমের মতই। আজ আর সেই বর্ণনায় যাব না। আমার জীবনের গল্পের শেষটা অনেক করুন। হয়তো এইজন্যই সুমধুর, স্বপ্নিল স্মৃতিগুলো রোমন্থন করলে মনটা ভারী হয়ে উঠে। শুধু এতটুকুই বলবো নিনা আমার জীবনের প্রতি চাওয়া-পাওয়া বাড়িয়ে দিয়েছিল। জীবনের প্রতি আমার চাহিদা কম বলেই এইচএসসি পরবর্তী অনেকগুলো ঝড়ও আমাকে হতাশ করতে পারেনি। নিনার সাথে সম্পর্ক হবার পরই আমার মনে হল একটা ভাল কিছু করতে হবে। আর্মি আর নেভিতে পরীক্ষা দিলাম। শেষ চেষ্টা হিসেবে মেরিনে পরীক্ষা দিব ঠিক করলাম। পরীক্ষার আগের রাতে নিনা পরীক্ষা দিতে না করলো। কিন্তু আমি ওর কথা শুনলাম না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমি মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং এ সুযোগ পেয়ে গেলাম। তখন ভেবেছিলাম এটা বিধাতার আশীর্বাদ। কিন্তু আশীর্বাদের রুপ ধরে আমার জীবনে যে অভিশাপ নেমে আসবে সেটাও দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। আমরা ঠিক করলাম আমি মেরিন একাডেমী থেকে বেরুনোর পরই আমাদের সম্পর্কের কথা নিনা বাসায় জানাবে। নিনার বাসার সবাই আমাকে মোটামুটি ভালই জানতো। তাই আত্মবিশ্বাস ছিল ওর বাসা থেকে কোন ঝামেলা হবে না। কিন্তু নিনার মা যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে তা কখনো ভাবিনি। নিনার মায়ের এক কথা, তিনি বেচে থাকতে তার মেয়েকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের সাথে বিয়ে দেবেন না। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারদের নাকি চরিত্র ভাল হয় না।






তিনটা মাস নিনা তার মায়ের সাথে যুদ্ধ করলো। নিনা এমনিতে ভীষণ মা ভক্ত মেয়ে। মাকে ছাড়া কিছু ভাবতেই পারে না। হাজার অনুনয়-বিনয়েও মায়ের মন গলল না। বরং মায়ের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের কাছে হার মানল। তার মা সাফ বলে দিল নিনা যদি পালিয়ে বিয়ে করে ওইদিনই তার মায়ের মরা মুখ দেখবে। নিনার বাবাও আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। কিন্তু স্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস ওনার ছিল না। কিছুতেই কিছু হলো না। নিনা একেবারে চুপসে গেল। প্রায় দেড় মাস আমার সাথে যোগাযোগ রাখল না। এর মধ্যে শুনতে পেলাম নিনাকে জোর করে বিয়ে দেবার পরিকল্পনা চলছে। আমার মাথায় যেন পুরো আকাশটা ভেঙ্গে পরল। পাগলের মত নিনাদের বাসায় ছুটে গেলাম। লজ্জার মাথা খেয়ে নিনার মায়ের কাছে হাত জোর করে নিনাকে ভিক্ষা চাইলাম। শেষ পর্যন্ত পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম। কিন্তু পাষাণী মহিলার মন একটুও গলল না। জীবনে প্রথমবারের মত হতাশা আমাকে ভয়াবহ ভাবে গ্রাস করলো। এরপরের ১৩টা দিন কিভাবে কাটিয়েছি আল্লাহই ভালো জানেন। ১৩দিন পর নিনা আমার ফোন করে দেখা করতে চাইলো। পরের দিন নিনাকে দেখে খুব অবাক হলাম। আমি যেন পুরনো নিনাকে ফিরে পেলাম। সেদিন সারাদিন আমরা একসাথে ছিলাম। যাবার সময় খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, যে করেই হোক তার মাকে রাজি করাবেই। তার মা নাকি আগের থেকে অনেক বদলে গেছে। আমার কাছে ও ৭ দিন সময় চাইল। ঠিক হল পরের সাপ্তাহে আমার বার্থডের রাতে সবকিছু জানাবে। নিনার চোখে সত্যিই সেদিন জ্বলজ্বলে আত্মবিশ্বাস দেখেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল নিনা সত্যিই পারবে। আমিও মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম নিনা যদি তার মাকে নাও রাজি করাতে পারে তাতেও সমস্যা নেই। দরকার হলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের চাকরীটাই ছেড়ে দেব। আমার ভাললাগার মানুষটার কাছে চাকরীটা আসলেই অতি তুচ্ছ।




আমি যেদিন মারা যাবো সেদিন হবে আমার দ্বিতীয় মৃত্যু। আমার প্রথম মৃত্যু হয়ে গেছে ৫ বছর আগে ২০০৭ সালের ৩রা নভেম্বরেই। যেদিন রাতে নিনার আমাকে সবকিছু জানানোর কথা ছিল। নিনার সবকিছু আমি জেনে গেছি পরেরদিন ভোরেই। তবে তার জন্য আমাকে নিনাদের বাসায় যেতে হয়েছিল। নিনাকে খুঁজে পেয়েছিলাম ফ্যানের সাথে ঝোলানো অবস্থায়। নিনার মুখটাতে তখনো হাসি মিলিয়ে যায়নি। হাতের তালুতে বলপেন দিয়ে লেখা ‘আমি পারিনি,আমায় ক্ষমা করে দিও টিয়া পাখি’... সেই থেকে হরিণের জীবনটা আসলেই থেমে গেছে। অনেক চেষ্টা করেছি নিজেকে সামলে নেবার। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। বাসার সবাই উঠেপরে লেগেছিল আমাকে বিয়ে দেবার জন্য। বিয়ের কথা শুনলেই আমার বড্ড হাসি পায়। ৫ বছর পরও নিনার বিকল্প হিসেবে কাউকে ভাবতে পারিনি। মেরিনের চাকরীটা ছেড়ে দেয়াটা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলাম। এখন বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়স্বজন একেবারেই সহ্য করতে পারিনা। তাদের সাথে কথা বললেই ঘুরেফিরে নিনার মৃত্যু অথবা আমার বিয়ের কথা তুলবেই। মেরিনের চাকরী করলে ৬-৭মাসই জাহাজে থাকতে হয়।তাই এদের কাছ থেকে দূরে থাকতে পারি। নিজেকে সবকিছু থেকে একা করে ফেলার জন্য এই চাকরিটা খুবই ভাল।





এখন আমার সময় কাটে বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে। প্রতিটা পোর্টে নেমেই অজানার উদ্দেশ্যে হাটতে থাকি। শপিং মল,রেস্টুরেন্টে
একা একা ঘুরে মানুষ জন দেখি। আমাকে দেখলে যে কেউ ভাববে আমি কিছু একটা খুজে বেড়াচ্ছি। আমি কি খুঁজি তা নিজেও জানিনা। হয়তো প্রতিটা মুখের মাঝে নিনাকে খুজে বেড়াই। পৃথিবীর প্রতিটা নারীর মুখের মাঝে আমি খুজে বেড়াই নিনার সেই মুখ। এর জন্য যে মাঝে মাঝে বিড়ম্বনায় পরতে হয় না তা না। গতবছরের চায়নার চিন্দাও পোর্টে নেমে ঘুরতে ঘুরতে একটা মোবাইল মার্কেটে ঢুকেছিলাম। একটা দোকানে ঢুকে আমি ভয়াবহভাবে চমকে গেলাম। আমি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এই যে দেখি সাক্ষাত নিনা আমার সামনে দাড়িয়ে আছে। আমি খুব বেশী আবেগি হয়ে গেলাম। মেয়েটা কি বুঝল কে জানে। আমাকে মোবাইল দেখাতে শুরু করলো। আমি তখনো ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ভাবলাম সবকিছু মেয়েটাকে খুলে বলি। কিন্তু দোকানের কেউ ইংরেজি বুঝে না। কিছু কিনতে ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমেই কিনতে হয়।




জাহাজ মেরামতের জন্য চিন্দাওতে ১ মাস থাকাকালীন কোন না কোন ছুতোয় ওর দোকানে যেতাম। ওর কাছে বেশ কয়েকটা মোবাইল কেনাতে এমনতেই ভাল সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি ওর দিকে তাকালে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতো। আসার দিন ঠিক করলাম যে করেই হোক ওকে নিনার কথা বলব। ওর দোকানের পাশেই কফিসপে ডাকলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে সহজেই রাজি হয়ে গেল। গুগল ট্রান্সলেটর দিয়ে ও প্রথম আমাকে যে প্রশ্ন করল তাতে আমি আরও চমকে গেলাম। ও লিখল, তুমি কি আমার প্রেমে পরে পরেছ? আমি কিছু না ভেবেই উত্তর দিলাম,হ্যাঁ। তারপর ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ট্রান্সলেটর দিয়েই নিনার কথা পুরোটা খুলে বললাম। নিনার গল্প যে ওকে স্তব্ধ করে দিয়েছে তা ওর চোখের পানি দেখেই বোঝা যায়। নিজের অজান্তেই আমার হাতটা চেপে ধরল মি অং রোজালিনা। আমি বললাম, তোমার মাঝে আমি আমার প্রেমের প্রতিবিম্ব খুঁজে পাই। আমি তোমার প্রেমে পরিনি, পরেছি আমার প্রেমের প্রতিবিম্বের আর সেই প্রেমেই আমি বার বার তোমার কাছে ছুটে আসি...





এরপর থেকে রোজালিনা আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে গেছে। চিন্দাও এলেই ওর সাথে আমার দেখা হয়। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও আমার জন্য কিছুটা সময় বের করে রাখে। গতবার ও আমাদের জাহাজে বেড়াতে এসেছিলো। সাথে করে নিয়ে এসেছিলো খুব দামি সিল্ক আর প্লাস্টিকের কিছু ফুল। মনে মনে ভীষণ রাগ লাগলো। আমার জাহাজে সবাইর জন্মদিন ঘটা করে পালন হয়, শুধু আমারটাই হয়না। নিনার মৃত্যুদিন আর জন্মদিন একই হওয়াতে কেউ আমাকে উপহার দেবারও সাহস করে না। ভেবেছিলাম রোজালিনা জন্মদিনের উপহার ফুল এনেছে। কিন্তু ও ফুলগুলো দিয়ে বলল, তোমার পাশাপাশি আমিও এখন নিনাকে খুব মিস করি। তুমি যখন দেশে যাবে তখন এই ফুলগুলো নিনার এপিটাফে গেঁথে দেবে। খুব ইচ্ছে করছিল তখন রোজালিনার হাতদুটো চেপে ধরি। কিন্তু পরক্ষনেই সামলে নিলাম। যে হাতদুটো শুধুমাত্র নিনার হাতদুটো ধরার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেই হাত কখনও অন্য নারীকে স্পর্শ করতে পারে না, যতই হোক না কেন প্রেমের প্রতিবিম্ব।



এই গল্প যখন লিখছি তখন আমার জাহাজ চিন্দাও পোর্ট থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা করছে। জেটিতে দাড়িয়ে রোজালিনা হাত নেড়ে আমাকে বিদায় জানাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে নিনাই যেন আমাকে বিদায় জানাচ্ছে, ঠিক যেমন আমি মেরিন একাডেমীতে যাবার জন্য ট্রেনে উঠলে ও হাত নাড়াতো।সত্যিকার ভালবাসার কখনো মৃত্যু হয় না, সেটা কোন না কোনভাবে বেঁচে থাকে আমাদের অনুভূতিগুলোর মাঝেই...

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top