
by- মাদিহা মৌ
.
এই যে বাবুইসাহেব!
কেমন আছেন আপনি?
কি করছেন এখন?
ঘুমাচ্ছেন?
নাকি কাজে গেছেন?
সাড়ে আট হাজার মাইল; তাই না?
কত দূরে থাকেন আপনি! আমাদের ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় না আপনার? জানি খুব কষ্ট হয়। সারাদিন কাজ করে এসে খাবারটাও বেড়ে দেওয়ার লোকটিও থাকে না। দুচারটে সুখ দুঃখের কথা বলবেন ওই মানুষ টিও নেই আপনার কাছে নেই। জানি সবই। তবুও মন যে মানতে চায় না। কতদিন দেখি না আপনাকে! খুব দেখতে ইচ্ছে করে আপনাকে। আপনার করে না?
.
আপনার মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে আপনি জানেন? আধো আধো বুলিতে কথা বলতে শিখেছে এখন! আমাকে কি ডাকে জানেন? মাআআই! এইটা কেমন ডাক হলো বলেন তো? মা তো সহজ। মা না ডেকে; ডাকে মাআই! আর আপনাকে কি ডাকে বলেন তো? বলতে পারছেন না? অনুমান তো করেন? পারছেন না? একটু চেষ্টা করেন? একেবারেই না পারলে শেষ মূহুর্তে বলে দেবো।
.
উফফফ! পারলেন না তো? আমি জানতাম পারবেন না! ও আপনাকে ডাকে বাবাই! মজা না বলেন? আমি ডাকি বাবুই; আর আপনার মেয়ে ডাকে বাবাই! কি মিল দেখেছেন? আমি কিন্তু শিখিয়ে দেই নি! নিজে নিজেই শিখে নিয়েছে ও।
.
মেয়েটা খুব রহস্যময়ী হয়েছে জানেন? হবে না! আপনার মেয়ে যে!
আপনার কথা এখন ঘুমুচ্ছে । আর আমি একা একা ছাদে এসে বসে আছি। অনেক দিন পর এলাম। এখন আর ছাদে আসতে ভালো লাগে না। সব কিছুতেই আপনার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এখানে এলেই হু হু করে কান্না চলে আসে। আটকাতে পারি না। আমার ছাদ প্রীতি দেখে কত পরিকল্পনা করে এই ছাদ বানালেন আপনি! মোটা করে রেলিং দিলেন পুরো ছাদে! আমি যেনো পা ঝুলিয়ে বসতে পারি। বিয়ে হয়ে গেলেও আমার দস্যিপনা যে সহজে যাবে না; কি করে যেনো বুঝে গিয়েছিলেন আপনি।
.
দুজনে মিলে কত ফুলগাছ লাগালাম পুরো ছাদ জুড়ে। রকমারি গোলাপ ফুল। আপনার পছন্দ ছিলো হলুদ গোলাপ আর আমার নীল। হলুদ গোলাপের চারা খুব সহজে পেয়ে গেলেও নীল গোলাপের চারা পেলাম না আমরা। তাই দেখে আমার চেয়েও আপনার মন খারাপ হলো বেশী। পুরো রোখ চেপে গেলো আপনার্। হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকলেন নীল গোলাপের চারা। কিন্তু আমাকে জানতে দিলেন না। তারপর আমার জন্মদিনে রাত বারটায় ছাদে নিয়ে উপহার দিলেন আমার অসম্ভব প্রিয় নীল গোলাপ। গাছ সহ। জীবনে প্রথম বারের মত আমার পছন্দের ফুল ছুঁয়ে দেখলাম । ফুলের উপর দুইফোঁটা অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়ল। না; আপনি আমার চোখের পানি মুছিয়ে দিন নাই। বরং ক্যামেরা হাতে আমার আর নীল গোলাপের ছবি তুলে ফেললেন । আপনার ছেলেমানুষি কান্ড দেখে হেসে ফেললাম আমি। আপনি চট করে আবারো ছবি তুলে নিলেন।
কোত্থেকে পেলেন সেই নীল গোলাপ;বললেন না আমাকে। দোলনা বসালাম নীল গোলাপের গাছটার পাশেই। আবার স্টীলের চেয়ার ও রাখলাম দুইটা। সিড়িঘরে সবসময় একটা শীতলপাটি থাকতো। সেই শীতলপাটিতে শুয়ে আমরা রাতের আকাশে তারা খুঁজতাম। কখনো চাঁদ দেখতাম। চাঁদের উপর মেঘের ছুটোছুটি দেখতাম। মনে পড়ে?
.
আমি এখন আর ছাদে আসি না তেমন জানেন? বৃষ্টি তে ও ভিজি না। চাঁদের উপর মেঘের ছুটোছুটি দেখি না। তারা ভরা আকাশে সপ্তর্ষি খুঁজি না। সব কিছু কেমন যেনো অর্থহীন মনে হয় এখন আমার কাছে। সারাদিন আপনার কথাকে নিয়েই পড়ে থাকি।
.
আপনার মনে আছে; যেদিন আমাকে আপনারা দেখতে গেলেন; একদেখায় ই আপনার পরিবার আমাকে পছন্দ করে ফেললো । আর আপনি! কি যে পেয়েছিলেন আমার চোখে; আপনি ই জানেন! যতক্ষণ আমি আপনাদের সামনে ছিলাম; আপনি পুরোটা সময়েই ঘরভর্তি লোকের সামনে আমার চোখের দিকেই তাকিয়ে থাকলেন। আমার পরিবার আপনাদের কাছে আম্মুর অসুখটার কথা না বলেই আমাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমি যখন নিজ থেকে অসুখটার কথা জানিয়ে দিলাম আপনাদের আপনার পরিবার বেঁকে বসলো। বলল; এই অসুস্থ মেয়ের সাথে কিছুতেই তাঁদের ছেলেকে বিয়ে দিবে না। আপনি ও কোন অংশে কম যান না। বললেন; বিয়ে করলে এই মেয়েকেই করবেন। আপনার একরোখা ভাব দেখে বাধ্য হয়ে বিয়েটায় মত দিলেন তারা।
.
আমার ক্ষতি হতে পারে ভেবে আপনি ঠিক করলেন; আমাকে বাচ্চা কনসিভ করতে দেবেন না। কিন্তু তখনো আমার রোগটা ধরা পড়েনি। তাই আমি একপ্রকার জোর করেই কথাকে কনসিভ করলাম .
.
.
কত কেয়ার করতেন আপনি আমার! কত আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন!
আর সেই আপনি গত একবছরে একটা চিঠিও লিখেন নাই আপনি আমাকে। কতদিন আপনার গায়ের গন্ধ পাই না! কি করে এতো ভাবলেশহীন হয়ে গেলেন আপনি? আমি যে পারি না! আমাকে একটু শিখিয়ে দিবেন? আমিও আপনার মত ভাবলেশহীন হতে চাই। কাঁদতে কাঁদতে আমি ক্লান্ত . . .
এতোকিছু বলার কারন কি জানেন? অবশেষে আমার রোগটা ধরা পড়েছে! ডক্টর বলেছেন; ইতিমধ্যেই কিডনির একাংশ ছেয়ে গেছে এলার্জি তে। ভেবেছিলাম আপনাকে কিচ্ছু জানাবো না। কিন্তু পরে ভয় ধরে গেলো । যদি আপনার আসার অপেক্ষা করতে না পারি? যদি তার আগেই মরে যাই? তাহলে চোখ দুটো তো একরাশ অতৃপ্তি নিয়ে কবরে যাবে। তাছাড়া আমার কথা? ওর কি হবে? আপনাকে তাই আসতে হবে। সব দায়িত্ব আপনার হাতে তুলে দেবো আমি। সেইসাথে দুচোখ ভরে দেখে নেবো আপনাকে।
.
এই শুনছেন? খুব রাগ করছেন আমার উপর? রাগারাগি এখন বাদ। আর আমি যদি আপনার অপেক্ষা নাইই করতে পারি; কথার জন্য ভালো দেখে একটা মা খুঁজে নেবেন। ঠিক আছে বাবুই পাখি?
.
আর কিছু লিখবো না। এখন শুধু আপনার ফেরার অপেক্ষা . . . .
ইতি
আপনার বৌপাখি
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন