লোকটি খানিকটা তেড়ে এলো, এবং আশেপাশের সবকজন কে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো, “আইজকাই শেষ দিন। আজকের মইধ্যে আমি এই ভেজাল থেইকে মুক্তি চাই। নাইলে কিন্তু কুকুরগুলার মুখে একটা জ্যান্তা খাওন পড়বো।” চেঁচিয়ে কথা বলাটা তেমন কোন সমস্যা নয়। এমনিতেও এখানকার মানুষ আস্তে কথা বলতে পারে না। তবে কুকুর বলতে লোকটি দু’পেয়ে নাকি চারপেয়ে প্রাণী বোঝাতে চেয়েছিলো, তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। কারণ মেয়েটির ছেড়া শাড়ির ফাঁক দিয়ে প্রকাশিত হওয়া শরীরখানা চোখ দিয়ে চেটে দেয়ার মতো কিছু চাহনী আমি এই সবজি ঘর থেকেও দেখতে পাচ্ছিলাম।
মেয়েটা চেষ্টা করলো লোকটাকে বোঝাতে। তার কন্ঠস্বর আটকে আটকে আসছিলো। পাত্তা না দিয়ে লোকটি অন্য কাউকে গালি দিতে দিতে সোজাসুজি হেটে যায়। দৃশ্যটি খুবই স্বাভাবিক। এ এলাকায় অহরহ এমন ঘটনা ঘটছে। দূর থেকে আমি লোকটার জুতোর শব্দ মিলিয়ে যেতে শুনলাম। মেয়েটার চোখে মুখে আপাত অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছিলো। আমি বা আমাদের আশেপাশের কেউ সোমবারের ব্যাস্ততম সকালে এদের আভ্যন্তরীন ঠোকাঠুকি কে গুরুত্ব দেয়ার মতো বিলাসিতা দেখাতে পারছিলাম না।
এই এলাকায় আমি বেশ অনেকদিন ধরেই ব্যাবসা করছি। এখানকার সবাই আমাকে সবজি চাচা বলে ডাকে। আমার চোখের সামনেই মেয়েগুলো এখানে আসে, যুবতী-তরুণী-বৃদ্ধা হয়। প্রথম আসার দিনটাতে এদের চোখমুখ থাকে অন্যরকম। বেশিরভাগ মেয়েই ভীষন ঘাবড়ে থাকে, প্রায় সবাই কাঁদতে থাকে প্রচন্ডভাবে। অঝরে কেঁদে যাওয়া এক একটা চোখ একসময় শুকিয়ে আসে। ছেলেমানুষী পবিত্রতায় ভরা মুখে রঙ চড়ে। সালমা হয়ে যায় সোমা, পাখী নামের মেয়েরা আটকা পড়ে বদ্ধ খাঁচায়।
এই মেয়েটাকে আমি প্রথম যখন দেখি, তখন তার বয়স মাত্র বারো-তেরো। অন্যদের মতো সে কিন্তু কাঁদছিলো না মোটেই। বিশাল বড়ো বড়ো দুটো চোখ দিয়ে পুরো এলাকাটা একেবারেই দেখে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছিলো। হাতে ধরা ছিলো প্লাষ্টিকের একটা পুতুল। মনে আছে, আমার দোকানের পাশের টংটাতেই এসে ঢুকেছিলো প্রথমে। চায়ের সাথে বিস্কুট ডুবিয়ে খাবার বায়না করছিলো বলে সাথের লোকটা ধমকে উঠেছিলো। মেয়েটাকে রেখে যখন লোকটা চলে যাচ্ছিলো, দৌড়ে পেছন থেকে পাঞ্জাবী টেনে বলেছিলো, “আমারে নিতে আসার সময় একটা রেহাল কিইনে আইনো বাজান! আমি কুরান রাখুম”
আহারে বেচারী। বহু পুরো কৈশোর সে তার বাজানের আনা রেহালের প্রতীক্ষা করে কাটিয়েছে।
এই পাড়ার সবক’টা মেয়ের এমন অদ্ভূত গল্প আছে। কেউ ভালোবেসে কারো হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছিলো, আজীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবার প্রতিজ্ঞা করা মানুষটা অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে তাদের এখানে ফেলে চলে গেছে। অথবা অসুস্থ বাবার মুখে শেষ ফোঁটা অষুধ গড়িয়ে দেবে বলে নিজেই পায়ে পায়ে এসে উঠেছে এই অন্ধকারের কুঠুরীতে। শুধুমাত্র দু’বেলা পেট পুরে খেতে পাবার লোভেও যে অনেকে এসে ওঠেনি, তাই বা কি করে বলি? মেয়ে নামের আপদগুলো যেখানেই যাক, দু’পেয়ে কিছু কুকুর তো থাকেই। অনিচ্ছায় হামলে পড়া কুকুরগুলোর কাছ থেকে বাঁচতে এরা স্বেচ্ছায় হাতবদলের ফ্রেমে আটকা পড়ে যায়।
প্রথম প্রথম এই মেয়েটাই প্রায় রোজ, আমার দোকানে এসে উঠতো। কোণের দিকে একটা টুল রাখা ছিলো, যে টুলে বসলে তার পা মাটি ছুঁয়ে যেতো না। পা ঝুলিয়ে গলার স্বরে নানা রকম সুর টেনে গম্ভীর হওয়ার ভাব ধরে বলতো, “তোমারে সবাই সবজী চাচা বলার কারণ কি? তোমার নাম নাই?” ব্যাস্ততার সময়ে আমার হিসেবের খাতাটা টেনে নিয়ে বলতো “আমারে দেও। তুমি কি জানো, আমি ছয় কেলাস পড়ছি? এইবার বাড়িতে গেলে বাজান আবার আমারে ইস্কুলে দিবো?”
আর একদিন খুব হন্তদন্ত করে ছুটে এসে আমাকে বললো, “ফাস কেলাস দেখে আমার একখান নাম দেও দেখি। সবাই বলতেসে নাম বদল দেওন লাগবো। বাজান তো নাই, তাই তুমার কাছে আইলাম”
আমি তার নাম রেখে দিয়েছিলাম, আলো।
আমার যখন উঠতি বয়স, তখন আমি এই পাড়ারই একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম। বোকাসোকা সেই মেয়েটাকে রোজ রোজ দেখার জন্যই এই এলাকায় আমার শেকড় গাঁথা। আমার ভালোবাসার মেয়েটা বড়ো ভালো ছিলো। অল্পতেই সুখী হওয়া অভ্যাস। আমার এখনকার ব্যাবসাটা তখন ছিলো না, কথা ছিলো খানিকটা টাকা জমিয়েই আমরা বিয়ে করবো। মেয়েটা হারিয়ে গিয়েছিলো অচেনা কোন রোগে। কিংবা হয়তো চেনা কিছুই, ডাক্তার বাড়ি গিয়ে নিশ্চিত করে তো জেনে আসা হয়নি কিছুই। আমরা দু’জন মিলে ভেবেছিলাম, আমাদের নিশ্চয়ই একটা মেয়ে হবে! সেই মেয়েটাকে আমরা এখান থেকে অনেকখানি দূরে নিয়ে যাবো। আমাদের মেয়েটা আকাশ দেখে বড়ো হবে, যে আকাশের রঙ ঝকঝকে নীল। তুমুল ঝড় বৃষ্টির সময়ে আমরা তিনজন মিলে বরফ কুড়ুতে নামবো, ভিজে নীল হয়ে আমাদের মেয়েটা কাঁপতে কাঁপতে তার ছোট্ট দু’হাতে আমাদের দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে। বাড়ির উঠোনের কোন একটা গাছে দড়িতে পিড়ি বেঁধে ওকে দোলনা বানিয়ে দেয়া হবে। সেই দোলনাটায় চড়ে সে নিশ্চয়ই আকাশ ছুঁতে শিখে ফেলতো! আমাদের মেয়েটার নাম সে রাখতে চেয়েছিলো “আলো”
এই এলাকাটার দুটো রুপ। দিনের আলোতে শহরের নানা প্রান্ত থেকে ছোটবড়ো ট্রাক- ঠেলা গুলো এসে জড়ো হয়। ছোটবড়ো মাঝারি ব্যাবসায়ীদের হইচই এ চাপা পড়ে যায় বাজারের শেষ মাথায় পড়ে থাকা ক’টা ছাল উঠে যাওয়া বাড়ি। দিনের আলোয় এখানে এসে কেউ টের পাবেনা, কত দুমড়ানো কান্না নিয়ে বাড়ি গুলো ঘুমিয়ে আছে। ওরা জেগে ওঠে সূর্য ডুবলে। সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ে শিকার হতে। কেউ কেউ উঠোনের কোনেই নিজেকে মেলে ধরে, দু দশ পয়সার বিনিময়ে নিজেকে বিকিয়ে দেয় এর থেকে তার কাছে।
আলো নামের মেয়েটা যখন এই অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিলো, সেই সময়ে একবার চোখভর্তি পানি নিয়ে আমার কাছে এসে হাহাকার এর সুরে বলেছিলো “তুমি আমারে বাঁচাইতে পারো? আমি এইখানে থাকতে চাইনা। আমি বাজানের কাছে যাইতে চাই। এরা অনেক কষ্ট দেয়।”
আমি কিছু করিনি। এখানে আসা মেয়েদের জন্য কারো কিছু করার থাকে না। খুব স্বাভাবিক নিয়মেই আর দশটা মেয়ের মতো আলো হারিয়ে গিয়েছে। আস্তে আস্তে তার বিশাল চোখ দুটো থেকে রাজ্যের প্রশ্নগুলো হারিয়ে সেখানে শূন্যতা জায়গা করে নিয়েছে চেপেচুপে। বাকী মুখগুলোর মতোই সহজ স্বাভাবিক রঙচঙে হয়ে গেছে মেয়েটা।
আর তাই পরদিন সকালে বাজারের শেষ মাথার ডাষ্টবিনে দুদিন বয়সী কাকে খাবলানো মৃত ছেলেটার পরে থাকার খবরের চেয়ে হরতালের কারণে সবজীর দাম বেড়ে যাবার খবর আমাকে বেশি বিচলিত করলো। দুদিনের মাথায় কমলা শাড়ির আঁচলে মাথা ঢেকে সন্ধ্যার শহরের ভীড়ে মিশে যাওয়ার সময় আলোর মুখটাকে এক ঝলক দেখে বুঝে নিয়েছি, সেও সামলে নিয়েছে বেশ।।
-তৃপ্ত সুপ্ত-
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন