১. আমি কয়েক মুহূর্ত ধরে শুন্য চোখে রিতুনের দিকে তাকিয়ে আছি । আমার চোখদুটো কোনসময়ই কোন কাজের না , এরা কান্নাকাটি করা ছাড়া আর বিশেষ কোন কিছু প্রকাশ করতে পারে বলে আমার মনে হয়না । এই মুহূর্তে রিতুন নামের এই এলোমেলো চুলের রীমলেস চশমা পরা ছেলেটার উপর আমার একইসাথে রাগ , বিরক্তি এবং অভিমান কাজ করছে ; অথচ আমার চোখদুটো তিনটি অনুভূতি একসাথে প্রকাশ করতে সফলতার সাথে ব্যর্থ হয়ে পুরোপুরি শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । আমার এই মুহূর্তে ভীষণ ইচ্ছে করছে এই বেয়াদব ছেলেটার শার্টের কলার ধরে মনের সাধ মিটিয়ে ঝাঁকাই , কিন্তু ঢোঁক গিলে ইচ্ছেটাকে হজম করে আমি শান্ত হয়েই বসে থাকলাম । রিতুন মুচকি মুচকি হেসে মাথায় হাত দিয়ে তার এলোমেলো চুলগুলি আরো এলোমেলো করতে করতে বলল , '' এই মেয়ে,কি হইল ? পড় না , পড়তেছিস না কেন ? '' আমি ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে আমার হাতে ধরে থাকা কাগজটার দিকে তাকালাম ,দুই পাশে মার্জিন টানা কাগজটাতে খুব সুন্দর কিছু অক্ষরে বেশ কিছু কথা লেখা আছে । সেইদিকে তাকিয়েই আমি মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললাম , '' আমি এখন পড়তে পারব না ; এই চিঠিটা তোর , তুই পড় - আমি শুনি ।'' রিতুন এক মুহূর্ত মুখ শক্ত করে বসে থেকে তার ব্যাগের চেইন খুলে '' রেসনিক আন্ড হ্যালিডে " নামক ব্যক্তিবর্গের লেখা জীবন্ত অত্যাচারের গোব্দা ভার্সন টা বের করে আমাকে দেখাল , '' দেখছিস তো এইটা , না ? এই চিঠি না পড়লে একটা গাট্টা লাগাব মাথায় ! '' আমি আবারও শুন্য দৃষ্টিতে তাকালাম। আমি জানি রিতুনের গাট্টা দেওয়ার ভয় দেখানোটা নিছকই '' ভয় দেখানো '' নয় , ভার্সিটি লাইফের দুই দুইটা বছর এই ছেলের গাট্টা আমি কম করে হলেও বিশবার খেয়েছি । তবুও আমি কখনো ওর সাথে রাগ দেখাতে পারিনা , ওকে ছেড়ে চলে যেতে পারিনা । এই এলোমেলো - অগোছালো ছেলেটার উপর কেন যেন আমার ভীষণ মায়া পড়ে গেছে , এই ছেলেটির সাথে কথা না বলে আমি থাকতেও পারিনা - কেন পারিনা তা হয়ত বুদ্ধিমান পাঠক কোনরকম দ্বিধা ছাড়াই বুঝে গিয়েছেন । এই অপারগতা লুকিয়ে রাখা যায় কি ?

আমি উপায় না দেখে চোখ গরম করে রিতুনের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম , তারপর চিঠিটা চোখের সামনে এনে পরিষ্কার গলায় পড়তে লাগলাম , '' প্রিয় রাত্রি , ভাবছিস , এই ইমেইল এফবির যুগে এসে কোন হতভাগা তোকে চিঠি লিখবার রিস্ক নিল ? হাসছিস হয়ত মুখ টিপে , কিন্তু আমি কি করব বল ? আমি যে মনের কথা বলতে ব্যাকুল , আর আমি বিশ্বাস করি একটা চিঠির প্রতিটি অক্ষরের সাথেই মনের গভীর থেকে উঠে আসা কিছু শুদ্ধ নরম আবেগ মিশে থাকে ,ঘ্রান নিয়ে দেখ ,তুইও হয়ত বুঝতে পারবি । আমি বেশ জানি, চিঠির এই বাঁধানো সীমাতেও আমি হয়ত তোকে বোঝাতে পারবনা তোকে আসলে কি বলতে চাই । তবু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি ? আমি শুধু বলতে চাই তোকে আমার ভাল লাগে ,জানিনা কতটা; এর পরিমাণটা হয়ত আকাশের মত , তার শুরুটা কবে হয়েছিল তাও জানিনা , শেষটাও জানবার নয় - আমি শুধু এটাই জানি, তোর মুখে হাসি দেখতে আমার ভাল লাগে, তোর অগোছালো চুলে বাতাসের লুকোচুরি দেখতে আমার ভাল লাগে , অনেক দূর পর্যন্ত তোর সাথে হেটে যাবার কথা ভাবতেও আমার ভাল লাগে- আমার ধারনা এটাই সম্ভবত ভালবাসা । তোরও কি আমার ব্যাপারে তাই মনে হয় ? জানিয়ে দিস । - রিতুন ।'' পুরো চিঠিটা পড়ে আমার দুচোখ ফেটে পানি আসার অবস্থা হতে লাগল । আচ্ছা সমস্যাটা কি ? চিঠির সাথে টিয়ার গ্যাসের কোন খালাতো-মামাতো সম্পর্ক আছে বলেতো আমার মনে হয়না , তবুও আমার দুনিয়া ভেঙ্গে কান্না আসছে কেন ? আমার মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষের কিছু বিচিত্র অনুভুতির শ্বাস প্রশ্বাসে সৃষ্টিকর্তা খুব যত্ন করে টিয়ার গ্যাস মিশিয়ে দিয়েছেন ,স্থান -কাল- পাত্র কোন কিছুই মানে না সেই অনুভূতি । আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম , রিতুন যেন আমার চোখের পানি না দেখে তাই চোখ রগড়াতে রগড়াতে বললাম , '' পড়লাম ,এখন খুশি ?'' রিতুন সবকয়টা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল ,'' জি বান্ধুবি , এইবার আমি সিঙ্গেল থেকে মিঙ্গেল না হয়ে কিভাবে যাই সেইটা দেখার আছে ! '' আমি কিছু না বলে বেকুবের মত হাসতে লাগলাম । হঠাত রিতুন মাথা এগিয়ে নিয়ে এসে বলল , ''নওরীন , শোন ! '' '' শুনছি , বল ।'' '' চিঠিটা তুই রাত্রির বইয়ের ভাজে রেখে আসতে পারবিনা ।'' আমি মাথা একদিকে কাত করে বললাম ,'' না পারার কি আছে ? পারব , তুই চিন্তা করিস না ।'' রিতুন লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিল , তারপর আমার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল ,'' থাংকু বান্ধুবি , তুই তো আমার জান টা লাগিস , তুই না থাকলে পলাশির মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রেম ভিক্ষা করা ছাড়া আমার আর উপায় ছিল না । হাহাহা ওভাবে তাকাতে হবে না , এখন বরং তুই পড় , আমি যাই ।'' আমি আবার শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রিতুনের চলে যাওয়া দেখলাম ।

দ্বিধান্বিত পাঠক হয়ত ভাবছেন এইটা কি হল ? না পেচিয়ে তাহলে বরং ভেঙ্গেই বলি , আমি রাত্রি নই- আমি নওরীন । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশের পর ভীষণ চুপচাপ মুখ লুকানো নওরীন নামের এই মেয়েটার সাথে সবার আগে যে ছেলেটার বন্ধুত্ব হয়েছিল সেই-ই হচ্ছে রিতুন । রিতুনের সাথে আমার যেদিন প্রথম দেখা সেদিন কেন যেন ওকে একটা চিরুনি কিনে দিতে আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল । চিরুনিটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছিল , '' নাও তো, এই অভাগা চিরুনীর জন্মটা সার্থক করে দেখাওতো দেখি ।'' কিন্তু জানালার পাশে একটা আসনে চুপচাপ বসে থাকা সেই মেয়েটি সেদিন পারেনি পাশে বসে থাকা ছেলেটির সাথে কথা বলতে ।তবে প্রতিদিন পাশাপাশি বসতে বসতে সংকোচটা একসময় ভেঙ্গেই যায়, হঠাত করেই আমি একদিন আবিষ্কার করি আমাদের মাঝে একটা অসাধারণ বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে । কিন্তু রিতুন ছাড়া আমার যেমন আর কোন ছেলের সাথে এতটা বন্ধুত্ব নেই , ওর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একদমই বিপরীত । সে পুরোপুরি রোমিও টাইপ একটা ছেলে ,নিজের একটা জুলিয়েট পাবার জন্য সে যে এই দুই বছরে মনে মনে কত মেয়েকে নোমিনেশান দিয়ে রেখেছে তা হিসাব করতে গেলে আমার মাথাই গুলিয়ে যায় । রাত্রি রিতুনের সেই লিস্টে নতুন সংযোজন । মেয়েটা আমাদের ক্লাসেই পড়ে , কোন সন্দেহ নেই - সে অপ্সরাদের মত সুন্দর । তবে রিতুনের লিস্টে এতদিন পর জায়গা পাবার কারন বোধ হয় তার আগের প্রেমিক - দুই সপ্তাহ ধরে মেয়েটা আবার সিংগেলের খাতায় নাম লেখাতে না লেখাতেই আমাদের সিক্স সিজনাল প্রেমিক রিতুনের মনে বসন্ত বাতাস হুলুস্থুলভাবে আনাগোনা শুরু করে দিয়েছে ।

রিতুন যখন আমাকে রাত্রির ব্যাপারে প্রথম বলল , আমি তখন একটা ল্যাবশীট লিখছিলাম ; আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি কলম থামিয়ে ওর দিকে একবার তাকিয়েই আবার লেখা শুরু করেছিলাম , ওর ক্রাশ খাওয়ার ব্যাপারটাতে আমি ঠিক লাঞ্চ আর সাপারের মতই অভ্যস্ত । তবে এইটা সত্য, রিতুনের ক্রাশ খাওয়ার কথা শুনে আমি প্রথমবার প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছিলাম , আমার কষ্টের সেই বিশ্রী অবস্থা দেখেই আমি বুঝে ফেলেছিলাম রিতুন আমার কাছে কতটা কি । রিতুন যখন দেখল , আমি ওর কথায় মোটেও পাত্তা দিচ্ছি না তখন ছো মেরে আমার ল্যাবশীট কেড়ে নিয়ে বলল , '' আমার সাথে আতেলগিরি দেখাবি না , একদম গুলি মেরে উড়ায়া দিব ! '' আমি পাংশু মুখে বললাম ,'' তাই দে ।'' '' কী ???'' '' কিছু না । রাত্রিকে পছন্দ হইছে ভাল কথা , ওকে বললেই পারিস , আমাকে শুনিয়ে কি লাভ ?'' রিতুন কাচুমাচু হয়ে বলল ,'' মেয়েদের মুখের কথায় পটানো যায় না কেন বল না ? কেউ আমাকে একসেপ্ট করেনা কেন ? '' আমি মুখ শক্ত করে বললাম ,'' কারন তুই একটা লুইচ্চা , উত্তরটা পছন্দ হইছে ?'' রিতুন ল্যাবশীট দিয়ে আমার মাথায় গাট্টা মেরে বলল ,'' ঐ পিচ্চি একদম পাকনামি করবি না বললাম ! এইবার আমি অভিনব সিস্টেমে প্রপোজ করব । চিঠি দিয়ে ! '' '' ওরে আমার রোমিও , চিঠি অভিনব ? আচ্ছা যাক ,তাও ভাল , চিঠি দে ; আইডিয়া খারাপ না ।'' রিতুন হাতে কিল মেরে বলল ,'' আইডিয়া আরো ভাল হবে কারন চিঠিটা তুই লিখে দিবি ?'' আমাকে হা করে থাকতে দেখে ও চুপসানো মুখে বলল ,'' এই কাজটা তুই করবি না ?'' '' মাফ চাই , আমি পারব না ।'' আমি এই কথা বলার সাথেই আমাকে মাফ করার বদলে শুরু হয়ে গেল ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল । রিতুনকে না বলার ক্ষমতা যদি বিধাতা আমাকে দিয়েই দিত তাহলে তো আমি কবেই বেঁচে যেতাম , এভাবে মরে শাখচুন্নি হয়ে ঘুরে বেড়াতাম না । তাই শেষমেশ আমি চিঠি লিখে দিতে রাজি হলাম । অতঃপর সারারাত চোখের পানিতে কাজল ছড়িয়ে চিঠি লেখা হল । রিতুনের মাথায় এতটুকু ঘিলু থাকলেও ও হয়ত বুঝতে পারত চিঠিটা আমি কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছি ।

পাঠক হয়ত আবারও ভেবে একশেষ হচ্ছেন , রোমিও রিতুন চোখ মেলে আমাকে কেন দেখতে পায় না ? আমি এই প্রশ্নের একটাই উত্তর জানি , তা হল - আমি ওর '' লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার'' সুন্দরীদের ক্যাটাগরিতে কোনভাবেই পড়িনা । তামাটে রঙের ছিপছিপে ছোটখাট একটা মেয়ে রিতুনের দুচোখে এটে বসা অদৃশ্য রঙ্গিন চশমায় কখনই যে ধরা পড়বার নয় সেটা আমার চেয়ে ভাল আর কে ই বা জানে । রিতুন যেখানে অপ্সরার মত কোন মেয়ের কোমর পর্যন্ত ছড়ানো চুলে বাতাসের লুকোচুরি দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় , সেখানে আমার কথা টেনে আনাই যে ভুল । আমার কাধ পর্যন্ত লম্বা চুল এক ছলকা বাতাসে কেবল উলটপালটই হয়ে যায় ; লুকোচুরি খেলা শিখবার অবকাশ তারা এখনো পায়নি । আমি যে পারিনা হাসির শব্দে ঝংকার তুলে রিতুনকে অন্য কোথাও হারিয়ে ফেলতে ,তাই ছোট ছোট হাসিগুলি ওর মনকে কখনই ছুঁতে পারেনা । আব্বু বলত , আমার চোখদুটো নাকি ভীষণ মায়াবী ; রিতুন আমার জীবনে আসার আগ পর্যন্ত তো এই কথাটা আমলেই নেই নি । কিন্তু এখন অনেক যত্নে যদিও বা কখনো কাজলে এঁকে দিতে চাই চোখের সীমানা , মোটা কাঁচের চশমার বাউন্ডারির আড়ালে পড়ে সেই কাজলরেখা যেন হারিয়ে যায় অনেক দূরে । কখনো কখনো ইচ্ছে করেই ওর সামনে চশমা খুলে মুছতে থাকি , ও কখনো তাকিয়ে দেখেনা আমার দুচোখের কাজলসীমানার মাঝে আমি শুধু কার ছবিটা বাঁধিয়ে রেখেছি । আমাকে চশমা খুলতে দেখলে ও বরং তাড়া দিয়ে বলে ,'' জলদি করে চশমা লাগিয়ে ঐ মেয়েটাকে দেখে বল তো আমার সাথে কেমন মানাবে ?'' আমার চোখের কাজলরেখা চোখের মাঝেই হারিয়ে যায় ভাষা না পাওয়া কিছু বোবাকান্নায় ।

চোখদুটো শুধুই জ্বলতে থাকে । এমন ছেলের প্রেমেও কেউ পড়ে ?

আমি সুকৌশলে রাত্রির খাতার ভাঁজে চিঠিটা রেখে লাইব্রেরীতে চলে আসলাম । কেন যেন মন ভাল লাগছে না , কাল রাতে না ঘুমিয়ে আমি একটা নয় , দুইটা চিঠি লিখেছি । সেই দুইটা চিঠির মাঝে একটা চিঠির দাম রিতুনের কাছে অনেক বেশি , সেই চিঠিটা হয়ত তার জুলিয়েটকে হাতের মুঠোয় এনে দেবে । কিন্তু অযত্নে পড়ে থেকে যে অন্য একটি চিঠির লেখাগুলো একসময় ঝাপসা হয়ে যাবে , রিতুন কখনো জানবেও না কতটা আবেগের মাঝে সেই চিঠিটার জন্ম হয়েছিল । আমি আমার খাতার মাঝে লুকিয়ে থাকা অবহেলিত সেই চিঠিটা টেনে আনলাম দৃষ্টির সীমানায় ।

'' রিতুন , আমি কখনো চাইনি কোন এক ফাল্গুনী বিকেলে একরাশ আগুন আগুন কৃষ্ণচূড়া হাতে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াও , আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি একটা নীল অপরাজিতাকে তোমার নিঃশ্বাসের কাছাকাছি এনে একবার আমার নামটি ধরে ডাকো ; তুমি ডাকোনি । আমি কখনো চাইনি তুমি আমার সাথে কাটাও কোন বৃষ্টিবিলাসী দিন , আমি শুধু চেয়েছিলাম আমার সিক্তচোখের স্পর্শ পাওয়া বৃষ্টিকনাটিকে তুমি হাত বাড়িয়ে একটু ছুঁয়ে দাও অনেক ভালবেসে ; তুমি ছুঁয়ে দাওনি । আমি তোমার স্বপ্ন হতে চেয়েছিলাম ,কিন্তু তোমার দুচোখের পাতায় বাসা বাঁধতে পারিনি কোনদিন । তবুও দেখ, আমার সব না পাওয়াকে দুহাত দিয়ে চেপে রেখে আজ আমি সূর্যের মত সুখি । জানো তো, এত আলোয় আলোকিত হয়ে থাকা সূর্যটাও সারাক্ষন নিজের ভেতর জমে থাকা আগুনে কেমন করে পোড়ে ! - নওরীন ''

আমি চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে থাকলাম । চিঠিটা এত ভারি লাগছে কেন ? কতটা ভালবাসা ধরে রাখার ক্ষমতা থাকতে পারে মামুলি একটা কাগজের ?

২. ক্লাসে নিজের সিটের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলাম রিতুন মাথা নিচু করে বসে আছে । আমি ওর পাশে ব্যাগটা রেখে বসলাম , রোমিও সাহেবের মন দেখছি ভালই বিষণ্ণ - আজ দাঁত কেলিয়ে হাই হ্যালো করছে না । আমি একটু কেশে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম , '' কি রে ? ক্রাশ খেয়েছিস আরেকটা ?'' রিতুন আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল , দুর্বল একটা হাসি । আমি আবার বললাম , '' কি হয়েছে ? বিলাই বিলাই হাসি দিচ্ছিস যে ?'' রিতুন ওর শার্টের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে আমার সামনে রাখল , আমি তাকিয়ে দেখলাম রাত্রির জন্য লেখা সেই চিঠিটা । আমার চোখেমুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখে রিতুন নিচুগলায় বলল , '' সকালে এসে দেখি চিঠিটা হোয়াইট বোর্ডের সাথে টেপ দিয়ে লাগানো । '' আমি ফিক করে হেসে ফেললাম , রাত্রি যে বেশ রসিক তা আমি শুনেছিলাম ,আজ বোধ হয় প্রমাণও পেয়ে গেলাম । রিতুন আমাকে হাসতে দেখে মোটামুটি খেপে গিয়ে বলল , '' হাসছিস কেন ? তোরা সব মেয়েরা বদের হাড্ডি । '' '' বেশ ।'' '' আমি আর সুন্দরীদের পিছে ধর্না দিব না , খুব ভাল টাইপ মেয়ে হলেই হবে , চেহারা ঘাটব না ।'' হঠাত করে কেন যেন অনুভব করলাম , আমার মাথায় ধীরে ধীরে রাগ উঠে আসছে । আমি মুখ শক্ত করে বললাম ,'' পারবি না । যেটা বললি সেটা জীবনেও পারবি না ।'' '' কেন ? এই কথা বললি কেন ?'' '' অবশ্যই যুক্তি আছে এই কথা বলার পেছনে , নইলে বলতাম না ।'' রিতুন সোজা হয়ে বসে বলল ,'' যুক্তি মানে ? চেহারা দিয়ে কি হবে ? গুন ই যথেষ্ট ! '' আমি হেসে বললাম ,'' খুব বলছিস , না ? একটা মেয়ের গুনের আগে তুই কি সত্যিই শুধু তাকে দেখবি না ? আচ্ছা বলতো, সে যদি কুৎসিত হয় তাহলে কি তুই ইন্টারেস্টেড হবি ?আমি বাজি ধরে বলতে পারি , খুব বেশি হলে তখন তোর মনে একটুখানি সহমর্মিতা জাগতে পারবে , আর কিছু না । কিন্তু একটা মেয়ে যদি দেখতে ভাল হয় , তখনই তুই ইন্টারেস্টেড হয়ে যাবি তার প্রতি- তার কথাবার্তা কেমন , তার গুন কি কি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি । অকারনে ভালবাসবার আগেই পটাতে চাস , সে যদি পটে যায় তাহলে সামনে আগাবি আর না হলে না , তাইনা ? আমি বড্ড সেকেলে রিতুন , বড্ড সেকেলে - তাই হয়ত ক্রাশ আর লাভ এই দুয়ের মাঝে আমি বোকার মত পার্থক্য খুজতে যাই । কিন্তু তবুও তুই আমার সামনে কিছু মনভুলানো মিথ্যে কথা কপচাতে আসিস না , যা করতে পারবি না তা বলার চেষ্টা করিস না , আমার সহ্য হয়না ।'' রিতুন এতক্ষন থমথমে মুখে আমার কথা শুনছিল , আমার কথা শেষ হতেই সে ডেস্কের উপর ভর দিয়ে বলল ,'' তুই এসব কি বললি , নওরীন ? কেমন করে বললি ?'' আমি অনেকবার ইতস্তত করে বললাম ,'' আই এম সরি , আই এম এক্সট্রিমলি সরি । আমার এসব বলা ঠিক হয়নি দোস্ত । '' '' না , না , তুই ...... '' রিতুন কথা শেষ না করেই থেমে গেল ।

ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর করিডোর ধরে হাঁটছিলাম আমরা । সকালের গুমোটে ভাবটা যেন কাটছিল না কিছুতেই । আমি স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে বললাম , '' কাল থেকে তো মিডটার্ম ব্রেক । তারপর ধুমায়া ক্লাসটেস্ট নিবে । পড়া শুরু কর, বুঝছিস ?'' '' আমি পারিনা কিছু । কাল তোর সাথে পড়তে বসব ।'' আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম ,'' আমি কাল সকালে বাস ধরব , কয়দিনের জন্য বাসায় যাচ্ছি । অন্য কারো সাথে পড়িস ।'' রিতুন হাটা থামিয়ে বলল ,'' মায়ের কোল ছাড়তে পার না , না ? অসভ্য মেয়ে একটা ! যেতে চাইছিস যা ,কিন্তু তোর খাতাটা আমাকে দিয়ে যা ।'' '' পারব না , আমার খাতা আমি দিব না ।'' ''আমি ফেইল করব তাইলে ।'' '' তাতে আমার কি ?'' রিতুন আমার মাথায় বিশাল সাইজের একটা গাট্টা দিয়ে আমার ব্যাগ খুলে ঢাউস সাইজের খাতাটা বের করে নিল । তারপর নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে গিয়ে বলল , '' এক সপ্তাহ এই খাতার চাঁদবদন না দেখলে তুই মরে যাবি না । টাটা ।'' আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে তাকিয়ে থাকলাম । রিতুন চোখের আড়াল হবার আগ পর্যন্ত তাকিয়েই থাকলাম । এক সপ্তাহ পর বাঁচব কিনা তার কি কোন গ্যারান্টি আছে ?

সন্ধ্যায় ব্যাগ গুছাতে গিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম , আমার সেই চিঠিটা আমি হারিয়ে ফেলেছি । উদ্ভ্রান্তের মতন আমি সব বইয়ের ভাঁজে তাকে খুঁজলাম , কোথাও নেই ; হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে যেন চিঠিটা । অবশেষে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম , আমার যে কেবল সবকিছুই হারিয়ে যায় । বেলায় আর অবেলায় ।

পরিশিষ্ট ঃ

পরদিন সকাল বেলায় রিতুনকে প্রবল বেগে সাইকেল চালিয়ে সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ডের দিকে ছুটতে দেখা গেল । খুব খেয়াল করলে দেখা যাবে , তার শার্টের পকেট থেকে একটা চিঠি খুব গোপনে উঁকি দিচ্ছে । মামুলি একটা কাগজের মাঝে যে কতখানি ভালবাসা জমে থাকতে পারে রিতুন সেটা কাল রাত থেকে টের পাচ্ছে ।

রিতুন ঠিক করেছে আজ নওরীনকে চশমা খুলে চুপ করে বসে থাকতে বলবে । চশমা ছাড়া বসে থাকা এই মেয়েটার চোখে রিতুন আগে থেকেই কেন যেন পরিচিত একটা মুখের ছবি দেখতে পেত , কখনো এটা নিয়ে ভাবেনি সে । কিন্তু কাল হঠাত করে বুঝতে পেরেছে , নওরীনের চোখে আঁকা সেই মুখটা শুধুই রিতুনের নিজের । সে সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দিল । নওরীনকে সে কিছুতেই চলে যেতে দেবে না ।

রিতুন বোকা হতে পারে , কিন্তু আজ আর কিছুতেই বোকামি করবে না সে ।

- seeny moni

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top