স্কুল থেকে ফিরেই রূম্পার প্রথম কাজ ধুপ করে তার ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়া। তারপর জুতাটা খুলে ফেলে কোনরকম ভাবে মোজাটা তাতে গুঁজে ধপাস করে তিন গোয়েন্দা বই নিয়ে বিছানায় ঝাঁপ দেয়া। এটা রূম্পার প্রতিদিনের রুটিন। হাত- মুখ ধোয়া না, খাওয়া না- তার আগেই বইয়ের ভেতর মুখ গোঁজা তার প্রথম কাজ।

- রূম্পা... রূম্পা... আরে এই রূম্পা...

- হু!

মায়ের চীৎকারে রূম্পা কোনমতে জবাব দেয়।

- এই মেয়ে, হাত- মুখ ধুয়ে নে... খাবার দিচ্ছি...

- হু!

- হু ... হু... না বলে আগে যা বলছি তাই কর... নাহলে মার খাবি কিন্তু... গল্পের বই পড়া আজই বন্ধ করে দেব...

এহেন হুমকিতে তো আর বসে থাকা যায় না। তড়াক করে উঠে সে বাথরুমে ছোটে। ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে। তাড়াতাড়ি খেতে হবে। ওদিকে রবিনের কি হল কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না! আচ্ছা! ভিলেনটা ড. টম নাতো! নানারকম চিন্তা মাথায় ঘুরছে। নাহ! তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করতে হবে। আম্মুটা যে কি! যদি একটু বুঝত! রূম্পা আনমনে মাথা নাড়ে...

*

রূম্পাকে কেউ যদি জিজ্ঞেসা করে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কি? লাফিয়ে উঠে সে জবাব দেয়- বই। রাত- দিন তার কাটে মজার মজার বই পরে। এত সাবধানে সে বই এর পাতা উল্টায় যেন সাত রাজার ধন সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। কোন বন্ধু তার বই এর কোন অংশ সামান্য এদিক ওদিক করে ফেললে আক্ষরিক অর্থে সে তাদের চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। বন্ধুরা মাঝে মাঝে হাসি ঠাট্টা করে আবার ভয়ও পায়। কিন্তু রুম্পার ভালবাসাকে হেলাফেলা করে না...

- এই রূম্পা... ওর বন্ধু পলা ওকে ডাকে... খুশিতে পলার মুখ ঝলমল করছে... জানিস, কাল ভাইয়া আমার জন্য চারটা বই কিনে এনেছে...

- কী! খুশিতে রূম্পা চিৎকার দেয়... পলার কাছে বই আসা মানে ও নিজেও পড়তে পারবে... আবার মনে মনে কিছুটা আফসোসও করে, ইশ! আমার যদি একটা বড় ভাই থাকত... তাহলে আর টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে বই কিনতে হতো না... আম্মুর কাছে যা চায় সবই পায়... শুধু বই – ই পায় না... তাহলে নাকি পড়ালেখা মাথায় উঠবে! রূম্পা ঠোঁট কামড়ে ভাবতে থাকে...

- কি ভাবতেছিস এত? শোন, আমি এখন শারলক হোমস পড়তেছি... পড়া শেষ হলে তোকে দেব...

- আচ্ছা! বলে সে মাথা নাড়ে... কিন্তু তর সয় না...মনে হচ্ছে পলা বই এর কথা না বললেই ভাল হত। এখন তো অপেক্ষা করতেই ওর জান বের হয়ে যাবে! তুই কিন্তু দ্রুত পরে শেষ করবি! নাইলে গাট্টা খাবি...

- ঠিক আছে, বাবা! মুচকি হেসে পলা বলে ওঠে...

*

স্কুলে রূম্পাদের দলটা একটু মিচকে শয়তান বলেই সবাই জানে। লেখাপড়ায় সবাই ভাল। স্কুল ডিসিপ্লিনেও ঠিকঠাক। এক এক জনের চেহারা দেখলে মনে হয় ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না। কিন্তু বাঁদরামি যা যা করে ওই চেহারার আড়ালেই করে! হাই স্কুলের টপ ক্লাসের স্টুডেন্ট হওয়ার পর বাঁদরামিটা গাছের মাথায় গিয়ে ওঠে। ক্লাসে সমাজ স্যারের পড়া শুনতে ভাল লাগছে না, তো টুপ করে ব্যাগ থেকে লুকিয়ে মাসুদ রানা বের করে বই এর তলায় রেখে পড়তে শুরু করে। টিচাররা মাঝে মাঝে চেকিং এ আসলে এক সারি থেকে বইগুলো আরেকসারিতে চালান করে দেয়। তারপর আবার নিজেরাই নিজেদের বুদ্ধিতে হেসে কুটিপাটি হয়।

- হু... ম্যাডাম যদি ধরে ফেলত না! খবর ছিল! তৃষা বলে ওঠে

- এই মেয়ের খালি উল্টাপাল্টা কথা... মিরা রাগে গজগজ করে... ভাল কথা বলতে পারিস না! যদি কোনদিন ধরা খাই তো তোরে ধরেই ভর্তা বানাব...

- কেন! আমি কি করছি! তৃষা তেতে ওঠে...

- আহা! ঝগড়া রাখ তো... রূম্পা বলে। নতুন প্রিন্সিপাল স্কুল লাইব্রেরি থেকে বই ইস্যু করার সিস্টেম করে দিছে... এখন তো আরও মজা...

সবার চোখ আগ্রহে জ্বলজ্বল করে...

*

রূম্পা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বই এর নেশা তো তার কমেইনি বরং দিন দিন বেড়েছে। এখানে এসে জানার আরও নতুন নতুন জায়গা তৈরি হয়েছে। রূম্পা অবাক হয় পৃথিবীতে এত কিছু জানার আছে! এত বই! সব পড়ে শেষ করা তো সম্ভব না! আহারে!

বই এর দোকানে গেলেই তার মাথা নষ্ট হয়ে যায়। মনে হয়, পুরো দোকান তুলে নিয়ে আসে। আর বইমেলা! সারা বছর ওই কয়েকটা দিনের জন্য চাতক পাখির মত অপেক্ষা! তারপর! ঈদদদ!!! প্রায় প্রতিদিন মেলায় যাওয়া। নিজের পছন্দ মত বই কেনা আর বাকিগুলো ছুঁয়ে দেখা। অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় তার... কেন যেন ওই বিচিত্র আলপনা আঁকা মলাটগুলোকে বড় আপন লাগে...

- ওই, এবার কয়টা বই কিনলি? ফাগুন রূম্পাকে জিজ্ঞেসা করে

- বিশটা!

- কিইইই!!! আরে তুই বই খাস না পড়িস! চোখ কপালে তোলে ফাগুন

- তোর মাথা!

- আমি অবশ্য কিনছি কয়েকটা। দাঁড়া... এইবার তোর সাথে কম্পিটিশন দিব...

- যা... ফোট! এমনিতেই বহুত দূরে আসিস! রূম্পা দেঁতো হাসি দেয়

- সত্যি... দেখ আমি কি করি...জিতলে তোরে ফুচকা খাওয়াবো...

- তাহলে পকেট খালি করার জন্য রেডি থাক...

দুই বন্ধু প্রতিযোগিতায় নামে। একেবারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই! শেষমেশ ফুচকা রুম্পার পেটেই যায়। কারণ মেলার শেষদিন সে আরও পাঁচটা বই কিনে ত্রিশটা বই লিস্ট করে! আর ফাগুন ওইদিন জরুরী কাজে আটকা পড়ে নিজের পকেট ফাঁকা করার বন্দোবস্ত করে ফেলে।



*

ছোটবেলায় রূম্পার আব্বু একবার বলেছিল, বই এর মত বড় বন্ধু নাকি আর হয় না! সেই আব্বুর হাত ধরে রুপকথার সাদা পরী, নীল পরীর সাথে তার পরিচয় শুরু। তারপর কত নাম না জানা রাজ্যে ঘোরা! সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দেয়া। সময় পেরিয়ে কখনও শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে গুহায় লুকানো, আবার কখনও বা সাগরের তলে ঘুরে বেড়ানো। এক বই সে একশ বার পড়েছে এমন নজিরও আছে! শান্তা পরিবারের সবাইকে যেমন চেনা মনে হয়, তেমনি যুদ্ধে প্রাণ হারানো ওই কিশোরটিকেও নিজের পরিবারের একজন লাগে। মাঝে মাঝে রোম্যান্টিক উপন্যাসের কোন নায়ককে দেখে ভাবে... আহা! তার জীবনেও যদি এমন কেউ আসত! এ খুব অদ্ভুত এক জগত! যে জগতে সে নিশ্চিন্তে লাফ দেয়... সাঁতরে ফেরে... তুলে নিয়ে আসে নির্মল কিছু আনন্দ! কিছু বাস্তবতা!

রূম্পার যখন খুব মন খারাপ থাকে তখন সে তার সারি সারি করে রাখা বইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কেন যেন তখন খুব ভাল লাগে। ওদের ছুঁয়ে দেখে... লাল, নীল, হলুদ... নানা রঙের আবরণগুলোর ওপর থেকে ধুলো সরায়... পরম মমতায় আবার আগের জায়গায় তুলে রাখে। ওর খুব ইচ্ছে ওর একটা বিশাল লাইব্রেরি হবে... যেখানে হাজারও বই থাকবে...একসময় হয়ত সেখানে তার পা ফেলার জায়গা থাকবে না! মার্ক টোয়েন এর মত! রূম্পা আনমনেই হেসে ওঠে...

সে জানে না তার এই স্বপ্ন পূরণ হতে কতদিন লাগবে। বেশি দিন নিশ্চয়ই নয়। আর হ্যাঁ! ওর আম্মু কিন্তু এখন আর ওকে কিছুই বলে না। বরং আরও উৎসাহ দেয়! রূম্পা জানে, ভালবেসে মন থেকে কোন কিছু চাইলে তা একদিন অবশ্যই পূরণ হয়। রুম্পারও হবে...



হতেই হবে!





- নক্ষত্রের মেঘ

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top