বৃষ্টির পরে কালো মেঘ
by কাজী ওয়ালীউল হাসান

শিশিরের মনটা আজ খুবই ভালো। আজীবন একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে। কিন্তু একটা মেয়ে তার জীবনটাকেই পাল্টে দিয়েছে। তৃপ্তি আজ তার মনের কথা শিশিরকে জানিয়েছে। সেই তৃপ্তি যাকে বলবে বলবে করেও ‘ভালোবাসি’ এ কথাটি বলা হয়নি শিশিরের।

খুব যে বেশিদিনের পরিচয় তৃপ্তির সাথে তা নয়।এই তো মাস তিনেক হবে। শিশির খুব ভালো গল্প লেখতে পারে। ফেসবুকে প্রায় প্রতিটি পেজেই তার গল্প ছাপা হয়। সাথে সুন্দর কবিতা। সেই সূত্র ধরেই তৃপ্তির সাথে পরিচয়। তৃপ্তি নিয়মিতই শিশিরের গল্প পড়তো। আর মনে মনে ভাবতো এত সুন্দর গল্প কিভাবে লিখে মানুষ। আর অধিকাংশ লেখাই ছিল ব্রেকাপ নিয়ে। ব্রেকাপ হলেও কিভাবে অনুপ্রেরনা পাওয়া যায় , নতুন ভাবে জীবন করা যায় এগুলোই ফুটে উঠতো শিশিরের গল্পে। আর তৃপ্তির আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুটা ছিল আসলে ওখানেই।

দৃপ্তের সাথে ব্রেকাপ হবার পর থেকেই ফেসবুকে নিয়মিত হয় তৃপ্তি। প্রথম প্রথম খুব বেশী আপসেট থাকত সে। বিভিন্ন পেইজের গল্প পড়তে পড়তেই শিশিরের লেখায় চোখ আটকে যায় তার। লেখাগুলা পড়ে খুব ভালো লাগে । ভাবে একটা মানুষ কিভাবে জীবনকে এত সুন্দরভাবে নিতে পারে। আবার এটাও ভাবে হয়তোবা লেখকের মনে অনেক দুঃখ। সেই দুঃখকে হাসিতে পরিণত করার রহস্য জানে শিশির। এভাবে অনেকগুলো গল্প পড়ে এক কথায় শিশিরের লেখার আসক্ত হয়ে পরে তৃপ্তি।

ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিবে দিবে করেও দেয় না তৃপ্তি। এত বড় লেখক। ভাব তার থাকবেই। হয়তোবা আমার রিকোয়েস্ট চোখেই পড়বে না। তবুও একদিন ঠিকই রিকোয়েস্ট দিয়ে দেয় সে। তৃপ্তিকে অবাক করে আধা ঘন্টার মধ্যেই বন্ধু হয়ে যায় শিশির।এভাবেই তাদের বন্ধুত্তের পথচলা।

তৃপ্তির ধারনা ছিল লেখক মানেই অহংকারী। কথা বললে পাত্তা না দেয়া। কিন্তু শিশিরকে যত দেখে ততই অবাক হয় তৃপ্তি। মানুষটার মন আসলেই সুন্দর।

প্রায় নিয়মিতই কথা হোত শিশিরের সাথে। একদিন কৌতূহল বসেই জিগ্যেস করে তার এমন গল্প লেখার উদ্দেশ্য কি? কারও কাছ থেকে কষ্ট পেয়েছে? জীবনটাকে আবার নতুন করে সাজাতে চায়? শিশির এ কথায় হেসে দেয়। যে কিনা সারাজীবন একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে আবার কে দিবে কস্ট? তার জীবনে কেউ নেই জানিয়ে দেয় শিশির। একই প্রশ্ন তৃপ্তিকে করে শিশির। তৃপ্তি তাকে সব জানায়। .............. দৃপ্তের সাথে তিন বছরের রিলেশন ছিল তার। কিন্তু দৃপ্তের বাবা-মা তার বিয়ে ঠিক করেছে অন্য মেয়ের সাথে। দৃপ্ত অনেক বুঝিয়েও বুঝাতে পারেনি তার বাবা মা কে। আর বাবা-মা র কথা রাখতেই শেষ পর্যন্ত বিয়েতে রাজী হয় দৃপ্ত। দৃপ্তকে কোন দোষ দেয় নি তৃপ্তি। হয়তোবা সে অনেক চেষ্টা করেছে বাবা মা কে বোঝাতে কিন্তু পারে নি। ভাগ্যকে মেনে নেয় তৃপ্তি। তবুও ভালো থাকুক দৃপ্ত। মা-বাবার বাধ্যগত সন্তান হয়েই না হয় থাকুক!! ফেসবুকের চ্যাটে মানুষকে দেখতে না পেলেও শিশির ঠিকই বুঝে নেয় ওপাশের মানুষটি অঝোর ধারায় কাঁদছে। অনেক সান্তনা দেয় তৃপ্তিকে। তার লেখা নতুন গল্পটা পড়তে দিয়েছিল সেদিন। তৃপ্তির প্রতি কেমন যেন একটা মায়া জন্মে যায় শিশিরের। আর তার নতুন সব গুলো গল্পই লেখতো তৃপ্তিকে উদ্দেশ্য করে। খুব ঘন ঘন কথা হতো তাদের। এক পর্যায়ে মোবাইল নম্বর নেয়া। মেয়েটার মন খারাপ থাকলে কেন যেন শিশিরের মনটাও খারাপ থাকে।ঠিক বুঝতে পারে না শিশির। এটা কী মায়া না ভালবাসা?

মেয়েটাকে কি বলা যাবে তার ভালোবাসার কথা? যদি তৃপ্তি কিছু মনে করে? আর বলা হয়ে উঠছিল না।............

পুরানো কথাগুলো মনে হয় শিশিরের। আজ সেই দিন। তৃপ্তিকে বলা লাগেনি কিছু। সে নিজেই তার ভালোলাগার কথা শিশিরকে জানায়।

বাইরের বারান্দার দিকে ছুটে যায় শিশির। আজ ঝুম বৃষ্টি। মনকে ছুঁয়ে দিয়ে যায় সেই বৃষ্টি। মন ভালো করা বৃষ্টি। তৃপ্তির মায়াতে পরেছিল অনেক আগে। আজ তৃপ্তিও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। বৃষ্টিতে খুব ভিজতে ইচ্ছে করছিল তার। তবে একা নয়, তৃপ্তির সাথে!!!!!!!!!

তৃপ্তির সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক এক সপ্তাহের হবে। ভালোবাসার স্বর্গীয় সুখ শিশিরের মাঝে। কিন্তু মাঝে মাঝেই আনমনা থাকে তৃপ্তি। পুরনো স্মৃতিগুলো হয়তোবা জড়িয়ে ধরে তৃপ্তিকে! তবুও তৃপ্তিকে তো সে কাছে পেয়েছে। নিজের মত করে পেতে নিজেকেই করতে হবে শিশির ভাবে। প্রচুর সময় দেয়া, রাত জেগে কবিতা বলা কিংবা গিটারের টুংটান শব্দ। সব কিছুই করে শিশির। মেয়েটা শিশিরকে ভালোবাসে কিন্তু কেন যেন মন থেকে না ; শিশিরের মনে হয়। প্রায়ই তৃপ্তির সাথে ঘুরতে যায় শিশির। আজকাল আর গল্প লেখা হয়না। কারন তার গল্প তো তার সাথেই। গল্প লেখার সময় কোথায় তার?

প্রেমের সম্পর্কের তিন সপ্তাহ পর সকালে শিশিরের মোবাইলে একটা মেসেজ আসে........ “ শিশির আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেছি কিন্তু মন থেকে কেন যেন আসত না। আমার মন সব সময়ই বলত আমার দৃপ্ত আমার কাছে ফিরে আসবে। আজ সেই দিন। দু’’দিন বাদে দৃপ্তের বিয়ে হবার কথা ছিল। কিন্তু তার বাবা মা র পছন্দ করা মেয়ের অন্য একটা রিলেশন ছিল যা দৃপ্ত জানত না। আজ সে জানতে পারে কেননা ঐ মেয়ে তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে পালিয়েছে। দৃপ্ত আমার জীবনে ফিরে এসেছে। আমি এতেই খুশী। তুমি কিছু মনে করো না। আমাদের সম্পর্ক খুব বেশিদিন হয়নি। আশা করি তুমি সব কিছু মানিয়ে নিতে পারবে। আমাকে ভুল বুঝ না। পারলে ক্ষমা করে দিও – তৃপ্তি ”

শিশির মোবাইলটা নিয়ে দাড়িয়ে থাকে কিছুক্ষন। কি করবে বুঝতে পারে না সে। যা কে নিয়ে ঘর বাধতে চেয়েছিল সে আর তার নয়। হয়তোবা কোনদিনই তার ছিল না। আজও আকাশে মেঘ। ঘন কালো মেঘ। কিন্তু বৃষ্টি নামছে না। তৃপ্তিকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভেজার সখ তার পূরন হয় নি। হয়তো এই শোকেই বৃষ্টি নামছে না; যে সে আর কখনোই তৃপ্তিকে নিয়ে ভিজতে পারবে না! বৃষ্টির বদলে আকাশে আজ কালো মেঘ। শিশির তার মনকে কালো মেঘের ছায়ার আড়ালে দেখতে পায়। হয়তোবা এই মেঘ কেটে যাবে একদিন। আবারও গল্প লেখায় মন দেয় শিশির। হয়তোবা তারই জীবনে ঘটে যাওয়া সেই গল্প !!

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top