বিয়ের স্টেজ। গান বাজনা হচ্ছে, আনন্দ হাসি ঠাট্টা হচ্ছে। কিন্তু কনের মন ভালো নেই। কেন থাকবে? বিয়েটা তার ভালোবাসার মানুষের সাথে হচ্ছেনা। ভালোবাসার মানুষ কী করছে তখন? হয় মারামারি করতে করতে এগিয়ে আসছে বা হয়তো কোথাও মদ খেয়ে চেগিয়ে পড়ে আছে। এটা একটা সিনেমার গল্প। বা সিনেমার মত গল্প।
বিয়ের স্টেজ থেকে কিছুদিন আগে ফেরা যাক। সেদিন মেয়ে বা ছেলের সাথে অভিভাবকদের ভীষণ ঝগড়া চলছে। ঝগড়ায় জিতে গেছে অভিভাবক। মেয়েটা একরাশ অভিমান চুলের মত করে বিছানায় বিছিয়ে দিয়ে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছে অথবা হাত পা কেটে রক্তারক্তি ব্যাপার। এটাও একটা সিনেমার গল্প। বা সিনেমার মত গল্প।
একটা সত্যিকারের গল্প করা যাক। বা একটা সত্যি গল্পের মত করে বলা যাক।
রায়হানের সাথে শর্মি'র সম্পর্ক চার বছরের। দুজন একই সাথে পড়তো। ভার্সিটির সেরা জুটি। পড়াশোনা শেষ করে দুজন চরম বিপদের মুখোমুখি হলো। বিপদটা এসেছে শর্মি'র বাসা থেকে। বাবা মা বিয়ের কথা বলছেন। ভার্সিটি শেষ করা একটা মেয়ের বয়স বিয়ের বয়স পার করে ফেলেছে বলেই সবাই মনে করে। আত্মীয় স্বজন, সমাজ, বন্ধু বান্ধব মোটকথা সমাজের প্রথা, কথা, আচরণ অনুযায়ী শর্মিকে বিয়ে করতে হবে। দু তিন রাত না ঘুমিয়ে একদিন শর্মি তার মায়ের মুখোমুখি হলো। অনেক সাহস জমিয়ে বলে দিলো-
"মা আমি একটা ছেলেকে পছন্দ করি"
এরপর আর দশটা পরিবারে যা হয় তাই হলো শর্মির সাথে। কেও মেনে নিলো না রায়হানকে। বাবা একটু নরম হয়ে রায়হানের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিলেন। ছেলে কিছু করেনা। এখনো চাকরী টাকরি পায়না। তাছাড়া আরো অনেক খারাপ অভ্যাস আছে। খারাপ অভ্যাসের কথা শর্মির বাবার কানে পৌঁছে দিয়েছে রায়হানকে পছন্দ করেনা এমন মানুষেরা।
বিয়ের স্টেজ। শর্মিকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। প্রত্যেকটি মেয়ের কাছেই এ দিনটি বিশেষ। বিশেষ দিনে মেয়েরা কান্না কাটি করে। তবে শর্মির কান্নার কারণ বাবা মাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যই শুধু নয়। রায়হানের বন্ধু আরিফ ফোন ধরে জানিয়েছে রায়হানের জ্বর। অসময়ে জ্বরের কারণ আবিষ্কার করতে পারলো একমাত্র শর্মি। ফুল দিয়ে সাজানো বিয়ের গাড়ি যখন শর্মিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে অজানা যাত্রায় তখন রায়হানের মাথায় পানি ঢালছে বন্ধুরা। রায়হান বিড়বিড় করছে- শর্মি কেমন আছ? কেমন আছ শর্মি?
...মাঝখানে আরো গল্প ছিল কিংবা মাঝখানে আরো গল্পের মত করে বলা সত্য ছিল। শেষ টানলাম আরেকটা গল্প দিয়ে।
শর্মির সাথে পথে দেখা হয় রায়হানের। শর্মির সাথে ছোট একটা মেয়ে। নামখানা তার- নিধি।
রায়হান নিধির হাতটা তার বিশাল হাতের মধ্যে নিয়ে টুকটাক গল্প করে। গল্প শেষে শর্মি হাসিখুশি ভঙ্গিতে বিদায় নেয়। রায়হান ভাবে- অনেক কিছু বলার ছিলো, কিছুই বলা হলোনা। থাক শর্মি ভালো আছে। সেও ভালো আছে। চাকরী জুটেছে একটা, সামনের মাসে মা বলেছে বিয়ে করতেই হবে। মেয়ের ছবি দেখেছে। বিরাট শুভ্র কপাল রায়হানের মন ছুঁয়ে গেছে। আচ্ছা শর্মির কাছে কি একবার অনুমতি চাওয়া যেত। না না , কী হাস্যকর হতো ব্যাপারটা!
বাস্তব এমনই হয়। তাই আমরা সিনেমার সুখ দেখে হাসি, কাঁদি। এই হাসি কান্না কতটা বাস্তবিক তা একবারও বোধহয় ভেবে দেখিনা। যারা ভাবে তারা সিনেমা দেখেনা। নিজের দুঃখ চিনলে, নিজের সুখ চিনলে পাগলের মত সিদ্ধান্ত নেয়না কোন প্রেমিক প্রেমিকা। প্রেম আর বিয়ে এক বিষয় নয়। অমতে, চাপে বিয়ে করে যদি মনে হয় দুঃখে মারা যাবো তাহলে অভিভাবকদের বোঝাতে হবে, বোঝাতেই হবে।
এবং হ্যাঁ। অবশ্যই যোগ্যতা জীবনে চলার ক্ষেত্রে খুব জরুরী কিছুই। জরুরী না হলে ভেগে টেগে বিয়ে করে আবেগের বশে অনেককেই বিয়ের দিন ছাড়া বাকীটা জীবন শুধু কাঁদতেই হবে। এত কান্না, এত দুঃখ শর্মি পায়নি সেদিন। শর্মির দুঃখ হয়েছিল এই ভেবে-
রায়হানের শার্টের বোতামটা ছেঁড়া, বাতাসে দুলছে। ঠিক করে দেয়ার মত কেও কি আছে রায়হানের? এ প্রশ্নটা করা হলোনা। বোকার মত স্বাভাবিক গতির চেয়ে একটু বেশি জোরে হেঁটে পালাতে হলো। কী মুখে নেয় অন্য মেয়ের খবর? এই ছেলেটা যে একদিন ছিল, ছিল শুধু তার একার।।
লিখেছেন - মাজহার মিথুন
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন