লিখেছেন Escherichia Coli
১।
ইরার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে মাস ছয়েক হল,বিয়ের পর এটাই আমাদের প্রথম ঈদ। চাকরী পাবার পর পরই মা পাত্রীর সন্ধানে লেগে পড়েন,আর এই ত্রিশ বসন্তের যুবকও তখন কোন এক তন্দ্রাবতীতে মেতে যাওয়ার চেষ্টায় ছিল। তাইত দিন ক্ষনের হিসেব টিসেব,পুঁথি পুঞ্জির বেশী মিলানো হয়নি। দুই পরিবারের সম্মতিতেই আমার সুখ রাজ্যে ভাগ বসায় ইরা। সাধারণ আমার জীবনে অসাধারণ ইরা। ইরার পড়াশুনা এখনো শেষ হয়নি। শেষ সেমিস্টারটা বাকি এখনো। বিয়ের পরই পুরো সংসারকেই গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত ইরা,মায়ার বিয়ের পর আমাদের সংসারটা এমনিই নীরব। তার উপর বাবা মায়ের খেয়াল,আমার খেয়াল,মাঝে মাঝে মায়া আসলে তার খেয়াল সব মিলিয়ে চলছে ইরার সংসার। সংসারে আমি বলতে চিরকালই নিরবই ছিলাম,এখনো এর ব্যতিক্রম হয়নি। শুধু বিলাসিতা স্বর্ণপত্র থেকে বেনসন এন্ড হেজেসে উন্নিত হয়েছে,এই যা। তাও ইরার দস্যিপনায় লুকিয়েই চলে,সব নিরবতার পর যখন ইরাও ঘুমিয়ে যায় ক্লান্তিতে তখন পাশ থেকে উঠে বারান্দাতেই হয় সুখটানের অভিমান। নিস্তব্ধতার এক ভয়ঙ্কর আকর্ষন আছে,এই আকর্ষনটা খুব বেশীই টানে আমাকে। কিন্তু হঠাত ভোরে ইরার চশমার ফাঁকের বকুনীতে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ঘুমাতে যাই। কালো ফ্রেমের চশমাটা জেকে বসে থাকে নাকের ডগায়,চশমা পড়া মেয়ে গুলো কি জন্ম থেকেই এমন থাকে। চশমার কাজই হয়ত এটা,আবেগকে অদ্ভুত ভাবে ঢেকে দেয়। ফ্রেমে ঢাকা চোখের ঝাপসা পৃথিবিতে খুব বেশীই শান্ত থাকে মেয়েটা। এইত এভাবেই চলে আমার সাথে ইরার খুনসুঁটি,দিন তো কাটে দূড়ত্বেই। ঈদ নিয়ে এবারই সবচেয়ে বেশী ব্যস্ত আমি,ব্যস্ততার কারণটাও ইরাই। মেয়েটার শপিং এর লিষ্টটার ভারে এখন রোজার আগে থেকেই ব্যস্ত আমি। ইরার মাঝে এক ধরনের কিশোরীপনা আছে,আমি যখন নির্লিপ্ত তখন ইরা সম্পূর্নই বিপরীত। দুজনের একসাথে থাকার স্বার্থকতাটা হয়ত এখানেই। আমার অপূর্ণতা গুলোকে পূর্ণ করেই যেন সাম্যাবস্থার বিক্রিয়া হতে থাকে। প্রিয়তার বিয়ের পর আর দেখা হয়নি ওর সাথে। হয়ত ভালই আছে,অসাধারণ কেউ হয়ত ইরার মতই ঘিরে রেখেছে প্রিয়তাকে,যে বলয় থেকে আমি বেরুতে পারিনা,যে বলয়ে প্রিয়তার চোখ কাঁদেনা। মাঝে মাঝে নিজেকে অনেক বেশী অপরাধী লাগে,ভালবাসার শতাংশের ভগ্নাংশও যে দিতে পারিনা আমি ইরাকে। তারপরও মেয়েটা যত্ন নিয়েই আগলে যায় আমাকে,আমার অস্তিত্বকে,আর আমার বিষন্নতাকে। বিষন্নতার সময় গুলায় একা একাই বুঝে যায় ইরা,তখন ফ্রেমের চোখ আর দস্যি মনে হয়না, এক নমনীয়তা এসে যায় সেই চোখে। বিষন্নতা নামক ভয়াবহ রোগটাকে সহজেই সারিয়ে দেয় মেয়েটা,কোলে মাথা রেখে যখন গল্পের ঝুড়ি ফোটে তখনি কোথা থেকে যেন রাজ্যের ঘুম এসে ধরে আমাকে। ইরা চালিয়ে যায় কথার আবর্ত,আর আমি ঘুমিয়ে যাই বিষন্নতাকে ফাঁকি দিয়ে। আর তারপর আবারো ঘুম ভাঙ্গে সেই চশমার ফাঁকের বকুনীতে। ইদানিং মাকেও কিভাবে যেন হাত করে নিয়েছে মেয়েটা,ত্রিশের ছেলেটা যখন মায়ের দস্যি ছেলে তখনি কেমন করে যেন ইরা শান্ত মেয়ে হয়ে গেছে মায়ের কাছে। আমার হয়েই সম্পর্কগুলাকে আরো গভীর করে নিচ্ছে ইরা। এখন বাবার সাথে আর পেনশনের টাকা তুলতে যেতে হয়না আমার,ইরাই ভার্সিটি সামলে কিভাবে যেন চলে যায়,মায়ার সাথে বিকালের চড়ুইভাতিতেও পাশে ইরাকেই পায় মায়া। আসলে পৃথিবীর সম্পর্কগুলা থেকে যতই আত্মকেন্দ্রিক আমি,ইরা ততই সামলে যায় আমার সম্পর্কগুলাকে। এভাবেই যুগান্তরের দূড়ত্বকে ছয় মাসেই নিঝুম অরন্যে ছুটি দিয়ে দিয়ে দিয়েছে ইরা।
.
২।
ঈদের শপিং করতে আজকেই প্রথম বেরুলাম আমরা। মাসের বেতন পেয়ে আর দেরী করতে ইচ্ছে হয়নি আমার,সর্বগ্রাসী মেয়েটাকে গ্রাস করতে যে আমারো ইচ্ছে হয়। শপিং এর লিস্ট তো আগেই করা ছিল,তাই আর দেরী হয়নি তপ্ত দুপুরে শীতল শপিং মলে ঢুকতে। ইরা এখন নিজের জন্য আর মায়ার জন্য শাড়ী দেখছে,আমি বিরস মুখে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। মায়া সেই পিচ্চিকাল থেকেই অনুযোগ গুলো সব অপুর্ণই রয়ে গেছে,বোন হিসেবে ছোটকালের দূর্ঘটনাটাই হয়ত ভাইয়ের প্রতি চাওয়ার দেয়াল তুলে রেখেছে। কাচের চুড়ি,চুলের ফিতা আর জ্বলজ্বলে নখ রাঙ্গানি কোনটার প্রতিই যে আকর্ষন নেই মেয়েটার্। মানিয়ে নিতে নিতে সম্পর্কের আবেদন গুলো বোধহয় হারিয়েই যায় একসময়। এবারই হয়ত প্রথম আমার আয়ে কিছু কেনা হচ্ছে মায়ার জন্য,অবশ্য সম্পূর্নটাই ইরার সাফল্য। টাকার চেয়ে ইরার ভালবাসাটা অনেক বেশী দামী,এই ভালবাসাটা কখনই মায়াকে দেয়া হয়নি আমার্। বোনের অলস বিকেলের বিমর্ষতা গুলোকে তাই দরজার ওপাশে রেখেই সরে গেছি আমি। আসলে আমার এই রোগটাকে সত্যিই সারিয়ে তুলতে চাই আমি। সম্পর্কের রসায়ন গুলোকে অজৈবই রেখে গেলাম সারাজীবন,বিষন্নতার ছুতোয় তিন দশক তো পেরিয়েই গেল। রসায়ন চিরকালই বিস্বাদ ছিল আমার কাছে,জৈব রসায়নের কঠিন বিক্রিয়া গুলো ব্যবহারিকের লবনের মতই ঠেকেছে সারাজীবন। তাই হয়ত জীবনের অজৈব স্বাদই ভাল লাগে আমার্। আসলে ভালবাসার প্রকাশ করাটাই হয়ত ভাল,মায়ার জালিকায় ভালবাসাগুলো সূক্ষ্ম প্রলেপ লাগিয়ে দেয়। তখন অধিকার জোড়ার ফাক গুলোকে নিশ্ছিদ্র করে দেয়। তাই হয়ত বন্ধনের আকর্ষন এতটা দৃড় হয়,আমার আর মায়ার এ আকর্ষন যে ক্রমেই কমছে টের ঠিকই পাই আমি। কিন্তু করার যে কিছুই নেই,আমার রোগটার যে কোন ঔষধ নেই,শুধুই বিষন্নতার বেনসনে সুখটান দিয়ে ইনসমনিয়াকে আরেকটু বাড়িয়ে দেয়াই আমার সাধ্যে। এর বিপরীতে চলার সাহস কোনদিনই হয়নি আমার,ভালবাসাটা যে চিরকাল দূর্বলতাই ঠেকেছে আমার কাছে। ইরার ডাকে সম্বিত ফিরে আমার্। শপিং শেষ ওর্। কেনাকাটার বিল মিটিয়ে আবার সেই উষ্ণতায় ফিরে আসি আমরা। উষ্ণতা আমাদের ক্লান্তি দেয়,ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় সব অভিযোগ। শীতলতা যে কোলাহলের বাইরে নিজেকে চিনিয়ে দেয় নিজের সাথে। তাইত শীতলতার কাছেই কাপতে থাকে মানুষ, কাঁপতে থাকে পুরোটা অতিত,ভবিষ্যত আর নিজের প্রতি আক্ষেপ নিয়ে।
.
৩।
আজকে বাসায় ফিরে আর ইরার সাথে দেখা হয়নি আমার,দুই বউ শ্বাশুড়ির বিনোদনের পূর্নতা আনতে নাকি তারা বাইরে গিয়েছেন। বাবা আর আমিই আছি বাসায়,আজ অনেকদিন পর বাবার সাথে একা আমি। আগে শুধুমাত্র পেনশনের টাকা তুলার সময়ই বাবার সাথে একা দেখা হত আমার,এখন সেই সুযোগটাও হয়না। আসলে হয়ত আমারই ইচ্ছা হয়না। দুপাশের দড়িতে ভাজ না থাকলে যে ইরার সাধ্য ছিলনা একে দৃড় করার্। বাবার সাথে খুব বেশী একটা বন্ধুত্ব আমাদের দুই ভাই বোনের কারোরই ছিলনা কখনো। বাবাও কোনদিন সেই সুযোগটা দেননি,আর আমরাও আগ বাড়িয়ে যাইনি কখনো মায়া বাড়াতে। স্কুলের বেতন,ঈদে বৈশাখে নতুন জামা,আর হয়ত কোন টুকিটাকি এই ছিল আমাদের দুইজনের চাওয়া। এর মাঝে কোনটারই কোন কমতি রাখেননি বাবা। প্রাচুর্যের জন্য জায়গা ছিলনা তার কাছে,কিন্তু চিরন্তন প্রয়োজন যে অপূর্ন রেখেছেন তা ঠিক না। আসলে বয়সটাই এমন ছিল যে বিলাসিতার প্রাপ্তি যদি শুণ্য থাকত অভিমানের খাতায় যে অভিযোগ লেখা হয়ে যেত। আজকে বুঝতে পারি এই দূড়ত্বের উপসংহার্। আসলে পরিবারের ই ছোট্ট ছোট্ট দূড়ত্ব,সংকোচ কখন যে পথের সীমা অতিক্রম করে যায় বুঝতে পারিনা। অনেকদিন পর আজকে বাবাকে বাবা ডাকতে ইচ্ছে করতেছে,আঙ্গুলের কড়ে ধরে বৈশাখের সেই ডালের জিলাপী খেতে ইচ্ছে করছে। সত্যিই বয়সটা সবই কেড়ে নেয় যেন,বয়সের সাথে জীবনটা জটিল হতে থাকে,জটিল থেকে জটিলতর বা কখনো জটিলতার জালে বন্দ্বীত্ব। বাবার নিজেরও আর সেও সময়টা নেই সেই দূড়ত্বকে দূড়ে রেখে কড়ে আঙ্গুল বাড়িয়ে বলতে চল বাপ,হেটে আসি। ভাবতেই অবাক লাগে,কেমন যেন আমাদের সম্পর্কটা,দুজনেই অনুভবেই সীমাবদ্ধ,পা বাড়ানোর সাহস কারোরই নেই। এইত আমিও হয়ত বাবা হয়ে যাচ্ছি তাড়াতাড়িই,একটা ক্ষুদ্র হাত হয়ত তখন আমার আঙ্গুল ধরে হাঁটতে শিখবে,সামনে দেখলে হয়ত আমাকে বদলেই দেবে সেই ছোট হাত পায়ের পিচ্চিটা। আসলেই পৃথিবীটা অদ্ভুত ধরনের সুন্দর,রীতির মাঝেই ঘুরছি আমরা। রীতির ভেতরই হয়ত ভয় পাওয়া আমার বুকে মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে আরেকটি তুলতুলে দেহ। মাঝে মাঝে কল্পনা করতে ভালই লাগে,আবার মাঝে মাঝে ভাবি নিজের মত বিষন্নতা দেয়ার জন্য পিচ্চিটাকে আনার কি দরকার। ভাল থাকুক না সে যেখানে আছে সেখানেই। হতাশার মধ্যে এক প্রচন্ড ক্ষতিকর দিক আছে,হতাশা সবকিছুতেই হতাশাকে খুজে দেয়। হারানোর মাঝে ফিরে পাবার চেতনা টাকেই খেয়ে ফেলে এই রোগটা। আর এই রোগটায় আক্রান্ত যে আমরা সবাই, পৃথিবীর মাঝে সুখের খোজ করতে করতে আমরা এতটাই ক্লান্ত হয়ে মুখ লুকিয়ে নিয়েছি যে তৃপ্তি আজ আমাদের খোজে। কথাতাই হয়ত সত্য,পাওয়ার সময় ফুরালে যে চাওয়ার আর কিছু থাকেনা। চাহিদা গুলোকে যখন চাপা দেয়া হয় তখন হয়ত চাহিদা গুলো বাড়ার স্বপ্ন দেখতেই ভুলে যায়। সেজন্যই আমরাও ভুলে যাই চাহিদা রংগুলোকে বর্ণিল করতে। দোষের ভাগ যে কাউকেই দেয়া যায়না,শুধু নিজের অবস্থান থেকে আক্ষেপ থাকে কেন হয় এমন? এর মধ্যেও এক ধরণের সুখ আছে,আর তা হল ভাঙ্গার ভয়টা থাকেনা আর। পিছুটান গুলো সহজেই এড়ানো যায়,সহজেই শহুরে কোলাহলকে পেড়িয়ে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া যায়। বাবা আর আমি দুজনই হয়ত সেভাবেই নিশ্চুপ হয়ে গেছি,সব কোলাহল কে জায়গা করে দিয়ে।
.
৪।
দেখতে দেখতে ঈদটা এসেই গেল,আর মাত্র কদিন। মায়ার এবার আসা হবেনা,শ্বশুরবাড়িতেই ঈদ করবে আমার বোনটা। ঈদের পর আমাদের বাসায় আসবে, বিয়ের পর এবার মায়ার প্রথম ঈদ না যে নতুন বউয়ের তকমায় দায়িত্বকে এড়িয়ে যাবে । আর প্রচণ্ড রকমের চাপা স্বভাবের আমার এই বোনটা তো এই স্বভাবের বিপরীতেই থেকেছে চিরটাকাল,নিজের সকল অনুভূতিটা সে একটা বাএক্সে পরম যত্নে জমিয়ে যায় শুধু নিজের জন্য। তাতে যে আর কারো ভাগ নেই। অবশ্য আমি আর ইরা গিয়ে গিফট দিয়ে এসেছি মায়াকে,মায়ার আপন সংসারকে গুছিয়ে নেয়া দেখে সত্যিই অবাক লাগে আমার। কতটা সহজেই না পারে মেয়েটা,পুরোটাকে ছেড়ে নতুন কাউকে আকড়ে ধরা। বাসায় আজকে উতসব লেগেছে কেন যেন,ইরাই ছটফট করছে বেশী আজকে। মা বাবার বিবাহ বার্ষিকি আজ। দিন ক্ষনের হিসাব কোনদিনই রাখিনা আমি,কেন যেন রাখতে পারিনা। চাইনা যে তা না,কিন্তু রাখার মত সুযোগটাই যে হয়না। ঐ যে আছেনা একটা কথা জড়তা,জড়তাটাকে কোনভাবেই দূর করতে পারিনা আমি। আমাদের বাসায় হয়ত আমার জ্ঞান হবার পর প্রথমবার মা বাবার বিবাহ বার্ষিকী পালন হচ্ছে। তাও আইডিয়াটা ইরারই। সবকিছুতেই সযত্নে ভাগ বসিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা,ভালই লাগে অগোছালো থেকে এরকম গোছানো আনন্দগুলো পেতে। আজকে মাকেই সবচেয়ে বেশী খুশী লাগছে,আমার পাগলাটে বাবাটাকেও দু একবার দেখলাম মুখ লুকাতে। বুড়ো বয়সে হয়ত লজ্জাটা এরকমই হয়ে যায়,লজ্জা নাকি ভালবাসা বুঝিনা আমি। সেই জন্মের পর থেকেই খুনসুটির জগতে দেখছি চিরকালই সমান্তরাল বাবা মার সম্পর্ক। দুজনের বন্ধনের মধ্যে একটা টান ঠিকই আছে,তারপরও আছেনা খুনসুটি,সেটাই সবসময় দেখায় আমাদের সামনে। আমার মাকে আমি এতটা খুশী এর আগে কখনই দেখিনি। আমাদের মধ্যবিত্তের গন্ডীতে হয়ত সব ত্যাগ মাকেই করতে হয়। আমার মায়ের মুখে জীবন্ত হাসি খুব কমই দেখেছি আমি,আজকে হয়ত বয়সের বিকেলে এসে নিজেকে ভারমুক্তই ভাবছেন তিনি। সত্যিই ভারমুক্তই করে দিতে ইচ্ছে হয় মাকে,অনেক তো চালালেন আমাদের আগলে রেখে। নিজের শখের কথা যে কোনদিনই ভাবেন নি উনি। ভাবার কথাটা মাথায়ও আনেননি হয়ত,মা ডাকটাই যে যথেষ্ট তার কাছে। মাঝে মাঝে অবাক লাগে সৃষ্টির এত নিগূড় সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে। মা নামক প্রশান্তিটা কি সত্যি কোন মানবী নাকি তারা অন্যজগতের সৃষ্টি। প্রত্যেকটা মেয়ে কতটা যতনে আগলে রেখে যায় এই নামটাকে,এই ডাকটাকে। এখানে এসেই হয়ত বিশ্লেষকেরা থেমে যান,এখানে এসেই হয়ত শেষ হয়ে যায় নারী পুরুষের প্রশ্ন। সব কিছুর শুরু আর শেষ যে এই একটা মানুষই,এই একজনই। ইরা কবে যেন মা বাবার একটা ছবি বড় করে বাধিয়ে এনেছে,আমি নইজেও জানিনা মেয়েটা কিভাবে সামলে নেয় এত দিক। এটা নিয়েই নিচে খোশগল্প হচ্ছে,বারান্দা থেকে ঠিকই শুনতে পাচ্ছি আমি। আজকে মনে হচ্ছে সত্যিই জীবনটা সুন্দর,সুন্দর জীবনটাতে নিজেকে গা ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় ইরাকে একটা বড় করে ধন্যবাদ দিতে,নিচে গিয়ে জীবনটাকে পুরোটা রাঙ্গিয়ে দিতে,মায়ের দস্যি ছেলে হয়ে আচলের নিচে নিজেকে লুকিয়ে নিতে। ঘুম পারানীর গান শুনতে শুনতে নিশ্চিন্তের এক ঘুম ঘুমিয়ে নিতে,বহুদিনের ক্লান্তি যে জমানো আছে আমার। কিন্তু কিছুই করা হয়না,চেয়ারে হেলান দিয়ে অন্ধকারে বেনসন নামক সেই ধোয়ায় হারিয়ে যাই আমি। ধোয়ার জগত বিভ্রম তৈরী করে,আর বিভ্রমই যে বিষন্নতার একমাত্র ঔষধ। বিভ্রমকে বড্ড ভয় পায় বিষন্নতা,বিভ্রমে থাকলে মানুষ হতাশাকে হারিয়ে ফেলে।
.
৫।
ঈদের পর মায়া এসেছিল কদিন আগে। মেয়েটা সুখেই আছে হয়ত,অথবা অভিনয় করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর মাঝে আর প্রিয়তার সাথে কখনো যোগাযোগ হয়নি আমার। হওয়ার বোধহয় খুব বেশী দরকারও নেই,জীবনটা তো চলছেই। মাঝে মাঝে অপরাধী লাগলে ইরা তো আছেই। চশমাওয়ালীটা সত্যিই দস্যি,এভাবেই তো ভাল আছি স্বার্থপর হয়ে। থাকি না যতদিন থাকা যায়। আজকাল ভালই আছি আমি,বেতন পাচ্ছি খাচ্ছি,চলে যাচ্ছে দিব্যি। সবকিছুর পূর্নতার পরেও শুণ্যতাকে এখনো অনুভব করি,শুন্যতা ভরানোর মত সময় যে এখনো আসেইনি। কোনদিন হয়ত পড়ন্ত বিকেলে চামড়ায় যখন ভাজ পড়বে সেদিন শূন্যতার অনুভুতিটাই ভুলে যাব। বেচে থাকাটাই যে মুখ্য,বাচার মত বাচার জন্য জন্ম হয়নি আমাদের। তাইত এতটা ভাবিওনা কখনো। যেভাবে যা চলছে,চলতে থাকুক। সব কিছুকে পাশ কাটিয়ে বিভ্রমে হারানোর সুযোগটা যে আছে। সেই সুযোগটাও আর বেশীদিন দিতে চায়না ইরা। এইত আজকেই শুনিয়ে গেল,আসছে কোন তুলতুলে হাত আমার বিভ্রমের জগত থেকে আমাকে সারিয়ে তুলতে। কাব্যের জন্য অপেক্ষা করছি আমরা সবাই,আমিও খুব বেশীই চাইছি আসুক এরকম কোন ছোট্ট তুলতুলে দেহ,যার জন্য বেনসন এনড হেজেসের সৃষ্টি গুলোকে লুকোতে হবে আমার। কোন একদিন হয়ত আর কিনতেই হবেনা। একটা কথা সত্যিই ঠিক,সময় নামক বস্তুটা সব কিছুকেই সামলে নিতে পারে। কত সহজ ভাবেই সব চলে যায়,আমরা নিজেরাই হয়ত জটিল করে ফেলি। অথবা জটিলতায় নিজেদের আটকে ফেলি। কিন্তু একটা সময় ঠিকই সব ঠিক হয়ে যায়,সবই ভুলে যায় মানুষ,সবকিছুকে ভুলিয়ে দেয় জীবন। আপন চক্রে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে জীবনের সুতীতে রঙ জমতে থাকে আমরা নিজেও হয়ত জানিনা। এভাবেই তো চলে আসছে জগত,এভাবেই চলবে। আমার ছেলেও হয়ত ত্রিশের কোঠায় এভাবেই ভাববে আমাকে নিয়ে যেমন আমি ভাবি,যেমন আমার বাবা ভাবতেন। হয়ত তখন কাব্য নিজেও অপেক্ষা করবে অন্য কোন কাব্যের জন্য যার সামনে তার বিভ্রমটাও কেটে যাবে। জগতে ভাল থাকার জন্য খুব বেশী দূর যেতে হয়না,পারফেক্টের সংগাটায় একটু মুচকী হাসি দিয়ে ছন্নছাড়া লিখে দিলেই হয়। খুব বেশী গোছাতে গেলে যে অগোছালোই থাকে সব।কি দরকার গোছানো হওয়ার,থাকুক না ঐ শব্দটা,জড়তা।
পরিশেষে ঃ জীবনে প্রথমবারের মত আই ইউ টি রিডিং রুমে গিয়ে আর কিছু না হোক,এই অকাজটা হল। মুক্তির নিশ্বাস যে কালো অক্ষরগুলোয়। ধারনা গুলোর জন্য পিয়াসের কাছে একান্ত ভাবে কৃতজ্ঞ।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন