ভালবাসার গল্প - একটি বন্ধুত্বের অবসান অতঃপর...
লিখেছেন - Fairuz Ahmed
ফ্রান্সের সবচেয়ে ছোট্ট গ্রামের নামটা কি? প্রিয়তি আমাকে যখন প্রশ্নটা করলো আমি তব্দা খেয়ে ওর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষন।
- জানিস না তো? বলে দিব?
আমি প্রিয়তির হাসিমাখা চেহারার দিকে তাকিয়ে হাই তুলতে তুলতে বললাম
- এইসব সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন রাখ। তোর উদ্দেশ্য কি সেটা বল আগে।
- আরে রামছাগল! তুই যে জানিস না সেটা বললেই পারিস। ফ্রান্সে আছিস ৬ বছর। তোর লজ্জা হওয়া উচিত।
লজ্জা পেতে আমার কোন সমস্যা নেই কিন্তু মানুষ কীভাবে রামছাগল হতে পারে এ ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। প্রিয়তির এসব ছলচাতুরীতে আমি দমে যাওয়ার পাত্র নই। উল্টা প্রশ্ন করলাম
- তুই তো জন্মের পর থেকে বাংলাদেশে আছিস! বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট্ট ইউনিয়ন এর নাম বল দেখি পারলে!
গ্রামের নাম আমিও জানি না। তাই ইউনিয়ন এর নাম ধরলাম। একবার ক্লাস সিক্স এর কুইজ প্রতিযোগিতায় এসেছিলো,তাই জানি।
প্রিয়তি কিছুক্ষন এদিক ওদিক মাথা দুলিয়ে কি যেন চিন্তা করলো এরপর ঠিকঠাক বলে দিলো সেন্টমারটিন।
আমার বোকা বোকা চেহারার দিকে তাকিয়ে প্রিয়তি হিহিহিহি হাহাহাহা করলো কিছুক্ষণ। তারপর মুখ খুললো
- চিন্তা করছি ‘ক্যাসেল-মরন-ডি আলবার্ট’ এ একবার ঘুরতে যাবো। পড়াশোনা করতে করতেই তো জীবন কাবার করে দিলি। এবার একটু ঘুরে ফিরে চারপাশ দ্যাখ।
স্মার্টফোনটা কাজে লাগানোর এটাই সুযোগ। গুগলে সার্চ দিলাম ভুলভাল বানান লিখে। জীবনেও শুনিনি এমন বিদঘুটে নাম। মানুষের নাম না প্রাণীর নাম গুগল মামাও একটু কনফিউশন খেয়ে গেলো প্রথমে। শেষমেশ সঠিক তথ্য দিতে পারলো গুগল। আসলেই একটা গ্রামের নাম। "Castelmoron d'Albret" ফ্রান্সের সবচেয়ে ছোট গ্রাম।
- যাবি আমার সাথে?
উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলাম না প্রিয়তিকে। প্রিয়তি জানে উত্তরটা ।
প্রিয়তির সাথে দেখা হওয়ার গল্পটা বলি। তখন আমার গ্রাজুয়েশন শেষের দিকে। পোস্ট গ্রাজুয়েশনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। একটা পার্ট টাইম জব করে আমি সুখে শান্তিতে দিন কাটাই। অর্থের চিন্তা করতে হয় না।
সকালের নাস্তা করাটা বরাবরই অসম্ভব বিরক্তিকর একটা ব্যাপার ছিল তখন আমার কাছে। ক্লাসের তাড়া থাকে। শান্তিমত নাস্তা করা যায় না। নাস্তা করার জন্য ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়া সবচেয়ে উত্তম জায়গা। ব্রেকফাস্ট খুব ভালো বানায়। লম্বা সিরিয়াল ধরে ব্রেকফাস্ট কিনা আমার নিত্যকার রুটিন। দক্ষিন দিকের কোনার টেবিলটা সপ্তাহের ৭ দিন খালিই থাকে। অন্যদের মনে হয় সেখানে বসা পছন্দ না। তবে আমার খুব পছন্দ। একদিন সকালে টেবিল এ বসার ঠিক আগ মুহূর্তে লক্ষ্য করলাম টি শার্ট জিন্স পরা এক মেয়ে ঢুকলো। ওয়েস্টার্ন আউটফিট হলেও রক্ষণশীল মনোভাব স্পষ্ট। আবার সলজ্জ বাঙালি বাঙালি একটা ভাবও আছে। ভারতীয়,পাকিস্তানী বা শ্রীলঙ্কান হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কথা হল, বিদেশের মাটিতে একটু দেশি গন্ধ পেলেই যেকোনো মেয়েকে পরী ভেবে বিভ্রম হয় আমার।
মেয়েটাকে আগে দেখিনি। মনের মধ্যে হিরোইজম লাফ দিয়ে উঠলো। খাওয়া অর্ধসমাপ্ত রেখেই মেয়েটার পাশে গিয়ে সুমধুর কণ্ঠে হ্যালো দিলাম। মেয়ে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে একবার তাকালো মাত্র। আমি তেমন পাত্তা না দিয়ে হাসি হাসি মুখে বললাম,ওয়েলকাম টু আওয়ার ইউনিভার্সিটি। মেয়ের মুখে হাসি ফুটলো না। একটা থ্যাংকস দিয়ে ভব মেরে থাকলো। আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী না। মেজাজটা সকালেই গেলো খিঁচড়ে।
আমি শতভাগ সিউর হলাম মেয়েটা বাংলাদেশের। বাংলাদেশ তো বটেই নির্ঘাত ঢাকার। ঢাকার মেয়ে ছাড়া এমন ভাব দেখানোর কথা না। দেশে না থাকলেও দেশের খবর মোটামুটি রাখি। ঢাকা শহরের কলেজ ভার্সিটি পড়ুয়া একটা গড়পড়তা সুন্দরী মেয়ে প্রতিদিন না হলেও শতাধিক ছেলের চোখের প্রশংসা আর তারও দ্বিগুণ পরিমাণ ছেলের চান্স খুঁজা দেখতে দেখতে নিজেকে মেগান ফক্স মনে করা শুরু করে। রহস্যময় হলেও সত্য, সেসব মেয়েদের যদি জিজ্ঞেস করেন কেমন আছেন? তাদের মুখের অভিব্যক্তিটা হবে আপনি তাকে প্রেম করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
মেজাজ খারাপ নিয়ে আর যাই হোক আমার গলা দিয়ে কিছু নামেনা। নিজে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম ব্যাপার না,হতেই পারে। পরিবার পরিজন ছেড়ে বিদেশে এসেছে হয়তো। তাই মুড অফ। মনের মাঝে সুশীল অংশ বলে উঠলো মাফ করে দেওয়াই ভালো।
ফলের জুসটা হাতে নিয়ে হালকা হালকা সিপ করতে করতেই দেখি ট্রে হাতে আমার সামনে দণ্ডায়মান মেগান ফক্স এর বাংলা ভার্সন। বাংলায় বলল – আমি কি এখানে বসতে পারি?
বললাম- বসেন।
এরপরের ঘটনা মেয়েটা আশা করেনি। ট্রে নিয়ে সুন্দর করে উঠে চলে আসলাম। ফিরেও তাকালাম না।
যে অনুভূতিটা পেলাম তার সাথে তুলনা চলে ছোটবেলার বোমবাস্টিং খেলার। যারা খেলছেন তারা জানেন টেনিস বল দিয়ে একজন আরেকজনের গায়ে সর্বশক্তি দিয়ে বল ছুড়ে মারার মধ্যে কি ব্যাপক আনন্দ। সেটা যদি হয় যার হাতে মার খেলেন তাৎক্ষনিক ভাবে তাকেই যদি আবার বল ছুড়ে শিকার করতে পারেন তাহলে তো আর কথাই নেই।
খোলা হাওয়ায় এসে একটা সিগারেট ধরালাম। কি সুন্দর ফুরফুরে অনুভূতি। নগদে সব শোধ-বাদ। ভাবে ভাবে কাটাকাটি।
সারাদিন নানা ব্যস্ততায় থাকি, মেয়েটাকে আর দেখলাম না কোথাও। আমি আবার টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট। ফার্স্ট ইয়ারের ছোটখাট কিছু কোর্সের টিউটোরিয়াল ক্লাস নেই। ক্লাস ভর্তি নতুন নতুন স্টুডেন্ট এর ভিড়ে মেয়েটাকে অনুপস্থিত পেলাম। দুই দিন হয়ে গেলো এরপরও ডিপার্টমেন্ট এ আসার নাম গন্ধ নেই। কাহিনী একটু গোলমেলে লাগলো আমার কাছে। এমন তো হওয়ার কথা না।
ডিপার্টমেন্ট এর রেজিস্ট্রার এ বসে এক মোটা মতো মহিলা। সেই মহিলা কে জিজ্ঞেস করলাম, আমার দেশ থেকে নতুন কেও আসছে নাকি? ওর ব্যাপারে আমার একটু তথ্য দরকার। মহিলা চুইংগাম চাবাতে চাবাতে বলল- আসলে কোন সমস্যা? মহিলাকে এমনিতেই আমার পছন্দ না। সারাক্ষণ কিছু না কিছু খাচ্ছে। বিরক্তিকর প্রাণী। তথ্য পেতে চাইলে মেজাজ গরম করা যাবে না। আরও নম্র হয়ে মহিলার একটু প্রশংসা করতেই মহিলা ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে নাম উদ্ধার করে দিলেন - প্রিয়তি আসফি। জন্মস্থান ঢাকা,বাংলাদেশ।
আমার চোখ ভুল কমই করে। কিন্তু মেয়েটা এমন ভাব নিলো কেন? অবশ্য ঢাকার মেয়ে হলে ভাব নিতে কোন কারন লাগে না।
রেজিস্ট্রার মহিলাকে আবার ধরলাম। প্রিয়তি তো ক্লাসে আসে না। ঘটনা কি?
মহিলা বলল- ওর তো জর। হোস্টেল এ রেস্ট এ আছে।
ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে আসলাম।
হোস্টেল এ গিয়ে প্রিয়তির রুম খুঁজে বের করলাম। জরে কাতর পুরোপুরি। রুমমেট একটা মেয়ে ওর মাথায় পানি ঢালছে। কথা বলার মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই। ওষুধের ব্যবস্থা করলাম। ডাক্তার ডেকে আনলাম। কোনকিছু লাগলে তৎক্ষণাৎ যেন আমাকে ফোন দেয় এসব বলে মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে চলে আসলাম সেদিন।
এই হল মোটামুটি প্রিয়তির সাথে আমার দেখা হওয়ার পরবর্তী কিছু ঘটনা।
সপ্তাহ না পেরোতেই ক্লাসে দেখতে পেলাম প্রিয়তি আসফিকে। ক্লাস শেষে আমার কাছে আসলো।
- অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সেদিনের জন্য। আমি এতই অসুস্থ ছিলাম যে আপনাকে বসতেও বলতে পারিনি। সরিইইইইইই...
এতো মিষ্টি করে সরি বললে কারো উপর কিছু বলা যায় না। আমি মন থেকেই অতীতের সব কিছু ভুলে গেলাম।
একটু কাঠখোট্টা একটু দেমাগি প্রিয়তি আসফির সাথে কীভাবে কীভাবে যেন আমার সম্পর্ক ভালো হয়ে গেলো। বিপরীত প্রকৃতির মানুষ সম্ভবত একে অপরকে আকর্ষণই করে। আমি শান্তশিষ্ট অথচ প্রিয়তি সারাক্ষণ হৈচৈ করছে। ওর লাল পছন্দ তো আমার সবুজ। ওর রিয়াল মাদ্রিদ পছন্দ তো আমার বার্সেলোনা। ওর অমলেট পছন্দ তো আমার মামলেট। তারপরও আমরা ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম।
প্রিয়তি আমাকে মাঝেমধ্যে দেশীয় খাবার রান্না করে খাওয়াতো। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ওর হাতে জাদু আছে। মায়ের হাতের পর কারো হাতের রান্না আমার খুব ভালো লেগে থাকলে সেটা ছিল প্রিয়তি। মা যখন মারা যান তখন আমার বয়স ১২ বছর, পারিপার্শ্বিক সব কিছু বোঝার মতো ক্ষমতা হয়ে গেছে। সৎ মা যখন ঘরে আসলো তখন আমি বুঝতে পারলাম ‘পর কখনো হয় না আপন’। কতদিন কতবেলা আমি পানি খেয়ে ক্ষুদার জ্বালা ভুলেছি তার হিসেব নেই। সৎ মা আমাকে খেতে দিতেন না ব্যাপারটা তা না। উনার কটুবাক্য শ্রবণের পর উনার তৈরি কোন খাবার আমার গলা দিয়ে নামতো না। প্রিয়তির রান্না আমার ভালো লাগবে এ আর বিচিত্র কি...
একাডেমিক ইয়ারে আমি প্রিয়তির বেশ বড় হলেও,বয়সে আমরা খুব কাছাকাছি ছিলাম। দুই মাসের ছোট বড়। তুই তোকারিতে যেতে আমাদের সময় লাগে দুই মাস। দুজনের মধ্যে মিলও ছিল অনেক কিছুতে। প্রিয়তির যেদিকটা বেশি আকর্ষণ করতো আমাকে তা ছিলো ওর ব্যক্তিত্ব। সৌন্দর্যের সাথে ওর ব্যক্তিত্ব ওকে অতুলনীয় করে তুলেছিলো। সময়জ্ঞান, অন্যকে বোঝার মানসিকতা এসব আলাদা গুনাগুন বাদই দিলাম।
প্রিয়তি বন্ধু হিসেবে চমৎকার। অভিভাবক হিসেবে বা সুপরামর্শদাত্রী হিসেবে খুবই ভালো। কিন্তু প্রেমিকা হিসেবে কেন জানি ওকে স্থান দেওয়া যায় না। সে যে আগে বিবাহিত ছিল সে জন্য না। সে হয়তো পন করেই বসে আছে এ জীবনে আর বিয়ের মুখ দেখবে না। ভালোবাসা ! সে আবার কি?
এ ব্যাপারে কিছুতেই ওকে দোষ দেওয়া যায় না। ইন্টারে পড়াকালীন সময়েই ওর বিয়ে হয়। এক মাসের মাথায় ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। স্বামীটা সম্ভবত সাইকো ছিল। মাতাল হয়ে প্রতিরাতে প্রিয়তির উপর নির্যাতন করতো, যতটুকু আমি শুনেছি ওর কাছে।
এটুকু বুঝি প্রিয়তির মনের তল পাওয়া বেশ কঠিন। এই হয়তো হাসিমুখে একটা কথা বলছে আমার সাথে কিন্তু ও এখানে নেই। ওর মন অন্য কোথাও। আমি ঠিকই বুঝতে পারছি কিছু একটা ঠিক নেই। ওর মন খারাপ।
আমি আর প্রিয়তি যখন ‘ক্যাসেল-মরন-ডি আলবার্ট’ গ্রামে পৌঁছালাম তখন মধ্যদুপুর। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাওয়ার অবস্থা। বাস থেকে নেমে দুই কিলোর মতো হেঁটে আসতে হয়েছে। গ্রামটা জনপ্রিয় কোন পর্যটন স্থান না তবে প্রাচীন ফরাসী স্থাপত্যকলার অনেক নমুনা এখনো বিদ্যমান। আমি পটাপট গ্রামের প্রবেশ মুখের কিছু ফটো তুলে ফেললাম। প্রিয়তি মডেলিং পোজ দিয়ে দাঁড়ালো অতি প্রাচীন কিছু ভাস্কর্য আর বাড়িঘরের প্রবেশমুখে। আমি বিটকেলে হাসি হাসতে হাসতে সেগুলো ক্যামেরাবন্দী করলাম। ফটোগ্রাফার হওয়ার সমস্যা একটাই, নিজের ছবি পরে হাজার খুঁজেও পাওয়া যায় না।
প্রিয়তিকে বললাম আমার কিছু ছবি তুলে দিতে, কিন্তু ও ততক্ষনে গির্জার এক পাদ্রীর সাথে আলাপে মশগুল। এটা যে গির্জা হতে পারে তা আমার ধারণার ও বাইরে ছিল। খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বড়োজোর একটা পোড়াবাড়ি বলা যেতে পারে। পাদ্রী আমার সাথে হাত মেলালেন। আমি পাদ্রীর সাথে একটা সেলফি তুলে নিতে ভুল করলাম না। কথায় কথায় জানতে পারলাম গ্রামে মাত্র একশত পরিবারের বাস। আঠারো শতকের শুরুর দিকে উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও পরে তা বেশিদূর এগোয়নি। পাদ্রী সাহেব আমাদের তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। খুব সাধারণ ছিমছাম জৌলুসহীন একটি বাড়ি। আশেপাশের আরও কয়েকটি বাড়ি থেকে মধ্যবয়স্ক কিছু পুরুষ মহিলা আমাদের দেখতে ভিড় করলো। নিতান্ত দারিদ্র্যপীরিত শহুরে আলো হাওয়া বঞ্চিত কিছু চেহারা। ওদের আঞ্চলিক ফরাসী কথাবার্তাগুলোর বেশিরভাগই আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো। প্রিয়তি বরাবরই সবার সাথে মিশুক। আমি আবার সহজে সবার সাথে মিশতে পারি না। কয়েকটি গ্রাম্য তরুণী প্রিয়তিকে হাত ধরে তাদের সাথে নিয়ে গেলো গ্রাম দেখানোর জন্য। আমি ওদের অনুসরণ করলাম।
প্রিয়তির হাসিমাখা চেহারা দেখতে ভালো লাগছিলো। শহুরে যান্ত্রিকতায় পিষ্ট হওয়া প্রিয়তি যে এতো সুন্দর করে হাসতে পারে তা আমি জানতাম না। শেষ কবে প্রিয়তি এতো প্রাণখুলে হেসেছে,কথা বলেছে অনেক চিন্তা করেও আমি স্মরন করতে পারলাম না। অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম গ্রামের দুকূল ছাপানো শোভা দেখতে দেখতে। প্রিয়তির ডাকে ধ্যান ভাঙলো-
- এইইইই কি ভাবছিস রে? ফুলগুলো দ্যাখ! কত্ত সুন্দর না? ঐ নীল ফুল গুলো এনে দে না...
একটা ঝোপঝাড় এর মত জায়গায় কিছু বুনো ফুল দেখতে পেলাম। নীল বলা চলে না, বেগুনী রঙের কিছুটা। আশেপাশে কাঁটা আছে। ফুল তুলতে গেলে কাঁটার খোঁচা খাওয়ার সমূহ সম্ভবনা আছে। প্রিয়তির হাসি মুখটা দেখে না করতে ইচ্ছে হল না। প্রিয়তি পেছন থেকে তাড়া দিয়ে চলেছে
- তুই কেমন বন্ধু আমার? এই সামান্য ফুল নিয়ে আসতে ভয় পাচ্ছিস।
ভয় আমি পেয়েছি সত্যি। কাঁটার পরিমাণ অত্যধিক। সাবধানে অগ্রসর হলাম। ঝোপের মধ্য দিয়ে হাত ঢুকিয়ে কয়েকটা ফুল ছিঁড়লাম। হাত বের করে আনার সময় ঘটলো বিপত্তি। কাঁটার খোঁচাতে হাতের তালু কেটে গেলো বেশ খানিকটা। মামুলি ব্যথা। এমনিতেই সেরে যায় সবার। প্রিয়তিকে দেখাতে চাইলাম না। কিন্তু আমার মুখের অভিব্যক্তিতেই ও কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে। দৌড়ে এসে আমার হাত ধরলো।
- ব্যথা পেয়েছিস? হাত মুঠ করে আছিস কেন? হাত খোল?
আমি যতই না করি কিছু হয়নি, ও ততই জোর করে।
- হাত খুলবি কিনা? দেখতে দে আমাকে।
দিলাম হাত খুলে। হাতের তালু রক্তে মাখামাখি। তারমধ্যে প্রিয়তির সেই নাম না জানা নীল ফুল গুলো।
- হায় খোদা। আমার জন্য তোর হাত কাটলো।
প্রিয়তি ওর ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে যত্ন করে আমার হাত ধুয়ে দিলো। তারপর অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। একটা মেয়ের কাছে কতকিছুই না থাকে।
ওর হাতটা ছাড়তে ইচ্ছে করছিলো না। যে হাত এতো যত্ন করে আমার হাত ব্যান্ডেজ করে দিতে পারে সে হাত কি পারেনা এভাবেই আমার হাতটা চিরকাল ধরে রাখতে?
ভাবনাটা মনের মধ্যেই মাটিচাপা দিয়ে দিলাম। প্রিয়তির দিকে চোখ তুলে তাকাতেও ভীষণ লজ্জা হচ্ছিলো। আমার মনের খবর বুঝে ফেললো কিনা! প্রিয়তি ভালো বন্ধু ভাবে আমাকে। প্রিয়তি যা চায়না তা চিন্তা করা সম্পূর্ণ অনুচিত। প্রিয়তি জানলে কষ্ট পাবে ।
- তোর ফুলগুলো কি হবে? আরেকবার চেষ্টা করে দেখি?
- লাগবে না আমার ফুল। যে ফুলের কাঁটায় আমার বন্ধুর হাত কেটে যায় সে ফুল না হলেও চলবে আমার।
হাঁটতে হাঁটতে কখন জানি আমরা গ্রামের শেষ মাথায় চলে এলাম টের ও পেলাম না। পেটের মধ্যে ইঁদুর বিড়াল দৌড়াতে শুরু করেছে আরও আগেই। ব্যাগপ্যাক থেকে খাবার বের করে খেলাম দুজন।
যাওয়ার কোন তাড়া ছিল না আমাদের। আবার ঘুরতেও আর ভালো লাগছিলো না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আবছায়া আলো আঁধারি খেলা চারপাশে তখন। ফিরে যাওয়াই মনস্থির করলাম ক্লান্ত শ্রান্ত দুটি প্রাণী। এবার একটু ঘুরপথে পাহাড়ি উঁচু নিচু রাস্তা ধরে বাসস্ট্যান্ডের পথে হাঁটা ধরলাম। আমি সামনে আর প্রিয়তি একটু পেছনে গাঁয়ের ম্যাপ দেখে দেখে নির্দেশনা দিচ্ছিলো। নাম না জানা কিছুর পাখির কিচিরমিচির শব্দ দেখে বুঝতে পারছিলাম ওরাও ঘরে ফেরার জন্য ব্যাকুল।
নীরবতা ভেঙে প্রিয়তি পাশে এসে জিজ্ঞেস করলো
- কিরে চুপ করে আছিস ক্যান?
- এমনিতেই।
আমার চুপ থাকতেই ভালো লাগছিলো। কথা বলার কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ কোন ভূত ভর করলো মাথায়... প্রিয়তিক জিজ্ঞেস করলাম
- তুই কি কাওকে ভালবাসতে পারিস না?
- কাওকে বলতে?
- ধর আমাকে?
- কি যে বলিস! তোর পুরাতন প্রেমিকারা আমাকে পিটিয়ে মারবে... হাহাহাহা ...
- প্রিয়তি আমি সিরিয়াস। এভাবে কতদিন থাকবি? তোর কাওকে দরকার। আমারও কাওকে দরকার। একসাথে জীবনটা পার করতে পারি না আমরা?
মনের গহীনে হাঁসফাঁস করতে থাকা বুদবুদটা হাওয়ায় ছেড়ে দিলাম। অনেকদিন বলতে চেয়েছি কথাটা,সাহসে কুলোয়নি। এরচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রিয়তিকে কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি যে খুব কঠিনভাবে প্রিয়তির প্রেমে পরেছি ব্যাপারটা তা নয়। একসাথে কারো সাথে চলতে ফিরতে গেলে তার প্রতি দুর্বলতা আসা অস্বাভাবিক কিছু না। আমার সে দুর্বলতা আরও আগেই প্রিয়তির জন্য ছিল। হয়তো দুর্বলতার চেয়ে বেশি কিছু। অনেকে হয়তো যাকে ভালোবাসা বলে। সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আমি ছিলাম কখন বলা যায়। এটাও জানি এতো চিন্তা করে কিছু হয়না। জানিনা সময়টা আমার জন্য সঠিক কিনা তবে কথাটা বলে ফেলতে পেরে নিজেকে অনেক ভারমুক্ত মনে হচ্ছিলো।
প্রিয়তির মুখে কোন কথা নেই। হয়তো জবাব গুছিয়ে নিচ্ছে মনে মনে কি বলবে। একটু কি কষ্ট পেয়েছে আমার কথায়? মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারছিলাম না।
- কিছু বল?
- এটা হয় না। আমি কাওকে ভালবাসতে পারি না। তোর সাথে আমাকে মানায় না। তুই এতো ব্রিলিয়ান্ট ছেলে হয়ে কেন আমার মতো বিবাহিতা ডিভোর্সি মেয়েকে ভালোবাসবি? সমাজ কি বলবে? আঙ্কেল অনেক ভালো একটা মানুষ। উনি খুব আঘাত পাবে জানলে। তুই আমাকে ভুলে যা... অনেক ভালো মেয়ে পাবি জীবনে...
প্রিয়তির চোখে পানি, আমি মৃদু হেসে টিস্যু এগিয়ে দিলাম...
আমি জানতাম উত্তরটা এমন কিছুই আসবে। অদ্ভুত হলেও প্রিয়তির প্রত্যেকটা কথা বাস্তব। এতদিন চলাফেরার পরও যখন প্রিয়তির সামান্যতম দুর্বলতা সৃষ্টি হয়নি আমার প্রতি তখন কীভাবে আমি আশা করি ও রাজী হবে আমার প্রস্তাবে। যতটুকু যা ছিল সবই বন্ধুত্ব।
বাসে উঠে বসলাম দুজন। প্রিয়তির মুখ থমথমে। আমি ওর হাতটা ধরলাম। প্রিয়তি আমার দিকে না তাকিয়েই আলতো করে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। রাতের বুক চিড়ে নিঃশব্দ গতিতে এগিয়ে চলছে আমাদের বাস, আমি প্রকৃতি দেখায় মনোযোগ দিলাম।
.
তিন বছর পরের কথা। আমি মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছি। আমার জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। আত্মীয়স্বজন সবাই আমার প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত। মুখে কিছু বলছে না বটে তবে আমি সবই বুঝি। ডজন দুয়েক মেয়েকে খালি হাতে ফিরানো হয়েছে। তাদের দোষ দিই না আমি। তারপরও আমি পাত্রী হান্টিং প্রোগ্রাম অব্যাহত রাখতে বলেছি। পুরো পৃথিবীতে ৭ জন মানুষের চেহারা সুরত সহ অনেক কিছুই একই রকম হবার প্রবল সম্ভবনা আছে বলে বিজ্ঞানীরা রায় দিয়েছেন। আমি হাল ছাড়ি না। সাতজনের একজন মাত্র ফরাসী দেশের রুপসুধা আহরণে ব্যস্ত। অন্য কোন ‘প্রিয়তি’ পাওয়া কি খুবই কঠিন?
.
লেখকের কথাঃ- যারা বৃহৎ এই রচনা পড়ে সময় নষ্ট করলেন তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
গল্প লিখার পরপরই যে জিনিসটা মাথায় আসছে তা হল,ঢাকার মেয়েদের দৌড়ানি খাওয়ার সমূহ সম্ভবনা আছে আমার। আমিও ঢাকার ছেলে। তাই উনাদের কাছে একটু এক্সট্রা খাতির পেতেই পারি দৌড়ানির বদলে।
আর জগতের সকল প্রিয়তিরা সুখী হোক, আমীন।
Home
»
আপনার লেখা
»
ভালবাসা
»
ভালোবাসা
»
ভালোবাসার গল্প
» ভালবাসার গল্প - একটি বন্ধুত্বের অবসান অতঃপর...
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন