h মায়াবতী
By- Nafi Sykes Sami

-তুই এতো বিরক্তিকর কেন?
-আমি আবার কি করলাম?
-বুঝেও না বোঝার ভান করিস না। মেজাজ আরও খারাপ হয়। ১ মাস আগে থেকে বলতেসি,আমার জন্মদিনে তুই না থাকলে আমি কোন অনুষ্ঠানই করবো না। আর আজ জন্মদিনের ১ সপ্তাহ আগে তুই বলতেসিস যে আসতে পারবি না। ফাইজলামি করিস আমার সাথে?
-আমি মোটেই ফাইজলামি করছি না। আমার ওই দিন পরীক্ষা আছে। আমার পক্ষে আসা কোনোভাবেই সম্ভব না।
-মর তুই। আর কখনও আমার সাথে যোগাযোগ করবি না।
খট করে ফোনটা কেটে গেলো।

নাফিস খুব ভালো করেই জানে, নিমির এই রাগ বেশি সময়ের জন্য না। কিছুক্ষণ পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। মৃদু হেসে ফোনটা নামিয়ে রাখে নাফিস। খোলা জানালাটার কাছে গিয়ে ঠেস দিয়ে দাড়ায়। আকাশটা ফিকে হয়ে এসেছে। সন্ধ্যা নামতে আর খুব বেশি দেরী নেই। ক্রমেই ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যের আলোয় লাল হয়ে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব বেশি খারাপ লাগছে না। কিন্তু,নিমির জন্মদিনের কথাটা চিন্তা করে একধরনের অস্থিরতাও মনের এপাশ থেকে ওপাশে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। পাগলীটার জন্মদিনে যাওয়াটা কোনোভাবেই মিস করতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু,ওইদিনের পরীক্ষাটাও তো মিস করা সম্ভব না।

চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া নাফিসের সাথে নিমির পরিচয়টা খুব বেশি দিনের না। প্রায় ২ মাস গড়াতে চললো।ফেসবুকে একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুইজনের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি,ভুল বোঝাবুঝির অবসান,ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো,চেটিং এর মাধ্যমে মৃদু আলাপচারিতা.........তারপর ধীরে ধীরে একটি সুন্দর বন্ধুত্তের সূচনা।সেই বন্ধুত্ত চলাকালীন সময়েই নাফিস কখন যে নিমিকে তার মনের কোঠরে স্থান দিয়ে ফেলেছে,সেটা সে নিজেই টের পায়নি। কিন্তু,এখনও নিমিকে মনের সেই এলোমেলো না বলা কথাটি জানাতেও সাহস পায়নি।ভয় একটাই,যদি এটা জানাতে গিয়ে পরবর্তীতে বন্ধুত্বটাই ভেঙে যায়।তবে নিমির মতো একজনকে পাশে পেয়ে নাফিস যারপরনাই খুশি। কিছু কিছু ভুলময় বোঝাবুঝি কিছু কিছু সময় ফুলময় একটি সম্পর্কের সূচনা ঘটায়। নাফিস আর নিমির ক্ষেত্রেও সেই ব্যাপারটিরই অবতারণা ঘটেছে। একটি ভুলকে কেন্দ্র করে একটি সম্পর্কের ফুল গড়ে উঠেছে।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা। সুন্দর এই সন্ধ্যার রঙিন আকাশে হঠাৎ করেই মেঘের আনাগোনা।জানালার পাশ থেকে সরে আসে নাফিস।হেলান দিয়ে চেয়ারটাতে বসতে না বসতেই ক্রিং ক্রিং শব্দে ফোনটা বেজে ওঠে। নিমি ফোন দিয়েছে।
-তুই আসলেই আসবি না আমার জন্মদিনে?
-আরে বাবা, পরীক্ষাটাই তো সব মাটি করে দিলো। তা না হলে তো আসতামই।
-হইসে,আর রাগ করার দরকার নাই।ভালো করে পরীক্ষা দিস।না আসলেও চলবে।পরে আসিস।
কথাটা বলেই মৃদু একটা হাসি দিয়ে ফোনটা কেটে দেয় নিমি।

নাফিস খুব ভালো করেই জানতো যে ঠিক এই ব্যাপারটিই ঘটবে।এটা নিমির পুরনো অভ্যাস। মনের চাপা কষ্টটাকে আটকে রেখে সবসময়ই নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করবে।

বাইরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে।আবারও জানালাটার পাশে গিয়ে দাড়ায় নাফিস। বৃষ্টির জল জানালার গ্রিল বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বৃষ্টি নেমেছিল সেদিনও যেদিন নিমির সাথে নাফিসের প্রথম দেখা হয়।দিনটার কথা মনে হলেই অজানা এক শিহরণ বয়ে যায় শরীরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ফেসবুকে চেটিং করা আর বাস্তবে সরাসরি কথা বলার মাঝে ঘোর তফাৎ। ছেলেরা যতই সাহসী হোক না কেন,একটা মেয়ের সাথে দেখা করতে গেলে প্রতিটা ছেলের বুকই দুরু দুরু করে কাঁপতে থাকে।তার উপর মেয়েটা যদি হয় ঢাকার প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ুয়া স্মার্ট একটি মেয়ে। দিনটি ছিলো শনিবার।শুক্রবার রাতে চট্রগ্রাম থেকে ঢাকার পথে পাড়ি জমায় নাফিস। পৌছাতে পৌছাতে সকাল ৬টা বেজে যায়।বাসস্টেশন থেকে বাসায় পৌঁছিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে উঠতে উঠতেই ১১টার মতো বেজে যায়। নিমির সাথে দেখা করার কথা দুপুর ২টায়। সময়টা যতই দুপুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো,নাফিসের বুকের দুরু দুরু ভাবটাও বেড়েই চলছিলো। দুপুর ১টার মধ্যে গোসল,খাওয়া-দাওয়া কমপ্লিট করে বাসা থেকে বের হয়ে যায় নাফিস। দুপুরের ব্যস্ত সময়টাতে সি.এন.জি অথবা একটা রিকশা খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়।কিন্তু,ভাগ্য সহায় হওয়ার কারণে নাফিসকে খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। খুব সহজেই একটা সি.এন.জি পেয়ে দ্রুত তাতে চেপে বসে।গন্তব্যস্থল:বসুন্ধরা সিটি। নাফিস যখন বসুন্ধরা সিটির সামনে এসে পৌঁছায়, তখন ২টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। নিমি তখনও এসে পৌঁছায়নি। অহেতুক বসে না থেকে এক চা খেতে খেতে অপেক্ষা করলে খুব বেশি মন্দ হবে না। ব্যাপারটা চিন্তা করে তৎক্ষণাৎ রাস্তার পাশের একটা চায়ের স্টলে চা খেতে বসে যায় নাফিস। চায়ে কয়েকটা চুমুক দেয়ার সাথে সাথেই হুটহাট কয়েকটা বিজলীর চমক আর সাথে সাথেই বৃষ্টির জলে ধুয়ে যেতে থাকলো চারপাশ। কোনোমতে চায়ের বিলটা পরিশোধ করে একটা ছাউনির নীচে এসে আশ্রয় নেয় নাফিস। বৃষ্টির সাথে তুমুল বেগে বয়ে যাওয়া বাতাসে মনে হচ্ছিলো,এখনই বড় বড় দালানগুলো ভেঙে পড়ে যাবে। অবাক হয়ে বৃষ্টি দেখতে থাকা নাফিস সম্বিৎ ফিরে পায় মোবাইল ফোনের শব্দে। সর্বনাশ!!!নিমি ফোন দিয়েছে।স্ক্রিনটা লক্ষ্য করে দেখতে পায়, এই নিয়ে এটা ৭ নাম্বার কল। বৃষ্টির শব্দের কারণে ব্যাপারটা টেরই পাওয়া যায়নি। নিমি নিশ্চয়ই বসুন্ধরা সিটির ভিতরে এসে ওকে ফোন দিচ্ছে। এখন এই বৃষ্টি আর বাতাসের মাঝে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়া তো মোটেই সম্ভব না।কথাগুলো চিন্তা করতে করতে ৮ নাম্বার কলের সময় ফোনটা রিসিভ করে নাফিস।
-কোথায় তুই?
-আমিতো বসুন্ধরা সিটির বিপরীত পাশের রাস্তার চায়ের স্টলে।
-তোর না বসুন্ধরা সিটির ভিতরে আমার জন্য অপেক্ষা করার কথা?
-আমিতো অনেক আগেই এসেছি। তোর দেরী দেখে আমি এই পাশে বসে চা খাচ্ছিলাম।
-আমি ঠিক ২টায় এসে তোকে ফোন দিয়েছি। তারপর থেকে ফোন দিয়েই যাচ্ছি।কিন্তু,তোর কোন রেসপন্সই পাই নাই।
-বৃষ্টির জন্য ফোন কল শুনি নাই।
-আমি বৃষ্টি নামার কিছুক্ষণ আগে থেকেই ফোন দিচ্ছিলাম। এখন, আমি আর কিচ্ছু শুনতে চাই না। এই মুহূর্তে তুই বসুন্ধরা সিটির ভিতরে এসে আমার সাথে দেখা করবি। ৫ মিনিটের মাঝে না আসলে আমি আর দেখা করবো না।
ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে যায়।

নিমির এই রকম জেদের সাথে নাফিস আগে থেকেই পূর্বপরিচিত। সময়মতো কিছু না হলেই ও একটু বিগড়ে যায়। ওর জেদের কথাটা চিন্তা করেই মনের দুরু দুরু ভয়ের ভাবটা আরও বেড়ে যায়।না জানি কপালে আজ আর কত কিছু লেখা আছে।

বৃষ্টি নামার আর সময়ও পেলো না।এখন কীভাবে এই ঝড়-বৃষ্টির মাঝে সে রাস্তা পাড় হবে।বিষয়গুলো চিন্তা করতে করতেই ২ মিনিটের উপর পার হয়ে গেলো। ঘড়িটা দেখে আর কিছু চিন্তা না করে বৃষ্টির মাঝেই রাস্তায় নেমে যায় নাফিস। তুমুল বৃষ্টির মাঝে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে যেতেই একেবারে ভিজে চুপসে যাওয়ার মতো অবস্থা। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ভেজা শরীরে শপিং মলটার ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই আবারও মোবাইল বেজে ওঠার শব্দ।
-৫ মিনিট শেষ। তুই কোথায়?
-আমি শপিং মলের ভেতরে। এন্ট্রি এর দরজাটার সামনে।
-দাড়াও,আসছি।
কিছুক্ষণের ভেতরেই নিমির দেখা পেলো নাফিস। প্রথম দেখাতেই চোখটা জুড়িয়ে গেলো। শুভ্রতার পরশ ছড়িয়ে আছে মেয়েটার চোখে-মুখে। দেখামাত্র নাফিসের মনে হল,এই মেয়েটা তার জীবনে না আসলে জীবনটা হয়তো অসম্পূর্ণই রয়ে যেতো। কিন্তু একটু আগে নিমিকে রাগিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা চিন্তা করে কিছুটা লজ্জা পেয়ে যায় নাফিস। চোখে চোখ রাখতেই কেমন জানি লাগছিলো।
-চল।
-কোথায়?
-ভেতরে দাড়িয়ে থাকবি নাকি?
নিমির সাথে বাইরে বের হয়ে আসে নাফিস। তখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ভিজিয়ে যাচ্ছিলো চারপাশ। সি.এন.জি. তে চেপে বসে দুইজন। নাফিস তখনও মাথা নিচু করে বসেছিল।
-রাগ করে আছিস আমার উপর?
-রাগ করবো কেন?
-আমার কারণেই তো তোকে বৃষ্টিতে ভিজতে হল। জানিসই তো,কেউ সময়ের হেরফের করলে আমার জেদ চেপে যায়। সরি রে।প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দে। আরে তোর চশমাটা দেখি একদমই ভিজে গিয়েছে।
কথাটা বলেই নাফিসের চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে রুমাল দিয়ে মুছতে শুরু করলো নিমি।
নাফিসের মনের ভয়টা ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করলো। মায়াবতী এই মেয়েটার প্রতি ভয় পাওয়ার তো কারণই থাকতে পারে না। মনে হতে থাকলো,দুজন দুজনকে বহুকাল ধরে চেনে.........
প্রথমদিনের দেখাতেই মায়াবতীটাকে অনেক বেশি আপন করে ফেলেছিল নাফিস। সেই ভালোলাগাটা ক্রমে ক্রমে ফুলে-ফেপে আজ ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে।কিন্তু, নাফিস কখনও কি তার ভালোবাসার কথাটা নিমিকে জানাতে পারবে কিন সেটা সে নিজেই জানে না............
অতীতের চিন্তা করতে গিয়ে মনটা আরও বেশি খারাপ হয়ে গেলো। নিমিকে অনেক বেশি দেখতে ইচ্ছে করছে। ওর জন্মদিনের ব্যাপারটা মাথায় আসলেই সব গুলিয়ে যাচ্ছে। জন্মদিনে দেখা করার ব্যাপারটা এখন সম্পূর্ণই ভাগ্যের উপর.........

ভার্সিটি,ক্লাস,পরীক্ষা সব কিছু মিলিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে দিনগুলো। নিমির জন্মদিনের তারিখটাও দ্রুত ঘনিয়ে আসতে থাকে।পরীক্ষা পেছানোর কোন সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না।ব্যাপারটা মনে হলেই বিমর্ষতা ছড়িয়ে যায় নাফিসের চোখে-মুখে।

২৯শে অক্টোবর,২০১৩-আগামীকাল নিমির জন্মদিন,সেই সাথে নাফিসের ফাইনাল পরীক্ষা। মুহূর্তগুলো কাটতেই চাচ্ছে না। খুব বেশি অস্থিরতা কাজ করছে। সন্ধ্যায় নিমির সাথে ফোনে কথা হওয়ার পর সেই অস্থিরতার পাল্লাটা আরও বেড়ে গেলো। তার প্রিয় মায়াবতীটার জন্মদিনে সে থাকতে পারবে না,এটা চিন্তাও করতে পারছে না।

রাত ১০টার দিকে মনের অস্থিরতার সাথে পাল্লা দিতে না পেরে শেষপর্যন্ত পরীক্ষাটা ড্রপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে নাফিস। হঠাৎ করে ঢাকায় পৌঁছে নিমিকে চমকে দিতে পারলে যে আনন্দটা পাওয়া যাবে,সেই আনন্দটা হয়তো আর কোথাও পাওয়া যাবে না। দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে নিতে হবে।হাতে সময় অনেক কম। ভোরেই রওয়ানা হতে হবে। তাহলে বিকেল নাগাদ পৌঁছে যাওয়া যাবে।আর ব্যাপারটা এমনভাবে করতে হবে,যাতে নিমি ঘুণাক্ষরেও টের না পায় যে সে ঢাকায় যাচ্ছে।

ভোর ৫.৩০ মিনিট: বাস ছাড়তে ছাড়তে ৬টার মতো বেজে গেলো। রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়ার কারণে বাসের সিটে শরীরটা এলিয়ে দেয়ার সাথে সাথেই চোখ অন্ধকার করে ঘুম নেমে এলো। দুলকি চালে ঘুমুতে ঘুমুতে কখন যে অনেকটা সময় পার হয়ে গেলো সেটা বোঝাই গেলো না। নাফিস যখন ঢাকায় পৌঁছালো,তখন ৫টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। নিমিকে একটা ফোন দেয়া যাক। দেখি পাগলীটা কি করছে......
-কই তুই?
-বাসায়।
-বাসায় মানে? আজকে না তোর জন্মদিন? বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যা।
-ওহ,আমার জন্মদিন সেটা তাহলে তোর মনে আছে? গতকাল রাত ১২টা তো দূরের কথা,সকাল আর দুপুর পার হয়ে এখন রাত নামতে শুরু করেছে।আর তুই আমাকে এখনও একবারও উইশ করলি না।
-আসলে পরীক্ষা ছিল তো।পড়ার চাপে সব ভুলে গিয়েছিলাম। ‘Happy Birthday’।
-ধন্যবাদ। পরীক্ষার চাপে আমাকেও ভুলে গেলি? ভালো। আমিতো তোকে বলেছিলামই যে তুই না আসলে কোন অনুষ্ঠান করবো না।তুই নেই,তাই কোন অনুষ্ঠানও করি নাই।
-ও আচ্ছা। আমি তাহলে এখন রাখি। পরে কথা বলবো।
নিমিকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দেয় নাফিস। পাগলীটাকে চমকে দেয়ার মুহূর্তটা চিন্তা করেই মুখে একটু দুষ্টু হাসি খেলে গেলো।
মহাখালী থেকে একটা সি.এন.জি.তে করে দ্রুত রওয়ানা দেয় নাফিস। ইস্কাটনে পৌঁছে সি.এন.জি.র ভাড়াটা মিটিয়ে নিমির বাসার সামনে যেয়ে দাড়ায়। প্রথম ওদের দেখা হওয়ার দিনে নাফিস রিকশায় করে নিমিকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলো। বাসার লোকেশনটা খুঁজে পেতে তাই কোন প্রকার বেগই পেতে হল না।
পকেট থেকে ফোনটা বের নিমিকে ফোন দেয়ার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে হালকা কান্নার শব্দ ভেসে আসে।
-তুই এতো খারাপ কেন? তুই খুব বেশি খারাপ। তোর কাছে আমার কোন দামই নেই। আজকের দিনে আসতে পারিস নাই, কিন্তু ভালোভাবে উইশ তো করতে পারতি। সেটাও করলি না।
-আমি অনেক বেশিই খারাপ। এখন খারাপ মানুষটারে দেখতে চাইলে বারান্দা দিয়ে তোর বাসার নিচের দিকে তাকা।
-মানে?
-মানে বাসার নীচে তাকাইতে বলসি।
-নিমি ফোনটা কানে নিয়েই দৌড়ে বাসার বারান্দায় এসে উপস্থিত হয়। উপর থেকে দেখে ফোনেই মৃদু একটা চিৎকার করে ওঠে: নাফিস,তুই.........
ফোনটা কেটে যায়।নাফিস বুঝতে পারে,পাগলীটা এখন হুড়মুড় করে নীচে নামতে শুরু করবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে নাফিসের সামনে এসে নিমি দাড়িয়ে যায়। চোখ দিয়ে বিন্দু বিন্দু করে জল ঝরতে থাকে।
-আরে পাগলী,কাঁদছিস কেন? আমিতো এখন তোর কাছেই। তোর জন্মদিন সেলিব্রেট করতে আসছি। এতে কাঁদার কি হল?
-আনন্দে কাঁদছি। তোকে অনেক মিস করছিলাম।
-এখন তো চলেই আসছি। এখন আর কাঁদিস না। রেডি হয়ে আয়।চল ঘুরতে বের হই।
নিমির কান্নাটা তবুও কেন জানি থামতেই চাচ্ছিলো না। নাফিসের খুব ইচ্ছে করছিলো,হাত দিয়ে নিমির চোখের জলটা মুছে দিতে।খুব ইচ্ছে করছিলো,হাতটা ধরে ওর ভালোবাসার কথাটা আজ জানিয়ে দিতে। কিন্তু কেন জানি সাহস হচ্ছিলো না।
-নাফিস, তুই তাহলে বাসায় আয়।একটু অপেক্ষা কর। আমি তাড়াতাড়ি রেডি হই। তারপর দুজন ঘুরতে বের হবো।
-তুই রেডি হয়ে আয়। আমি নীচেই অপেক্ষা করছি। উপরে যেতে ইচ্ছে করছে না।
-ঠিক আছে।আমি ১০ মিনিটের মাঝে আসছি।
নিমি ঘুরে দাড়িয়ে আবার দ্রুত বাসার ভিতরের দিকে হাটা ধরলো। হঠাৎ করেই নাফিসের কি যেন মনে হয়ে গেলো। কিছু চিন্তা না করেই নিমিকে আবার পেছন থেকে ডাকলোঃ
-নিমি, তোকে একটা কথা বলতে চাই।
-হ্যাঁ, বল।
-আমি তোকে ভালোবাসি। তোর হাতটা আমাকে সারাজীবনের জন্য ধরতে দিবি?
নিমি কথাটা শুনে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। নাফিসও কথাটা বলে বোকার মতো দাড়িয়ে রইলো।
-নাফিস, তুই এতদিন ধরে.........
কথাটা শেষ না করেই নিমি হেঁটে বাসার ভিতরে ঢুকে গেলো।
নাফিস বুঝতে পারলো,সে অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। নিমি নিশ্চয়ই তাকে বন্ধুর থেকে বেশি আর কিছুই কখনও ভাবেনি। আজ কথাটা শোনার পর থেকে ও হয়তো আর সম্পর্কই রাখবে না। আবেগের বশে কথাটা বলে ফেলা মোটেই উচিৎ হয়নি। নিজেকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। সারপ্রাইজ দিতে এসে নিজেই নিজের বোকামির কারণে সব ভেস্তে গেলো। নিমির বাসার সামনে থেকে দ্রুত একটি সি.এন.জি.তে করে বাস-স্ট্যান্ডের দিকে যাত্রা শুরু করে নাফিস। নিমিকে এই মুখটা আর দেখাতে ইচ্ছে করছে না।খুব বেশি লজ্জা লাগছে নিজের কাছেই। যে মানুষটা বন্ধুত্তের সুবাদে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো,সেই মানুষটাকে প্রপোজ করার সাহস দেখানোটা মোটেই উচিৎ হয়নি। নিজের ভুলের কারণে সম্পর্কটাই নষ্ট হয়ে গেলো।

বাস-স্ট্যান্ডে নেমে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক পাইচারি করার পর মনে হল,যাওয়ার আগে নিমিকে ফোন দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলে হয়তো একটু ভালো হবে। নিজের অপরাধবোধটা তাহলে কিছু হলেও কমানো যাবে। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে আনে নাফিস,কিন্তু নিমিকে ফোন দিতে একটুও সাহস হচ্ছিলো না। এদিকে বাস আর ১০ মিনিটের মাঝেই ছেড়ে দিবে। এখন টিকেট না কাটলে পরে আর যাওয়া যাবে না। ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রেখে সামনের দিকে পা বাড়ায় নাফিস।দ্রুত টিকেট কেটে বাসে চেপে বসে।উঠে বসার কিছুক্ষণ পরেই বাসটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। নাফিসের কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো। কতো কষ্ট করে নিমিকে চমকে দিতে এসে নিজেই একটা বোকামি করে সব ভেঙে দিলো।নিমি কি আর কখনও দেখা করবে না? বুকটা ফেটে কান্না আসছে।

বাসটা কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পরই নাফিসের মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনটা পকেট থেকে বের করেই আঁতকে ওঠে নাফিস। নিমি ফোন দিয়েছে। ফোন ধরাটা কি উচিৎ হবে? রিসিভ বাটন প্রেস করবে কি করবে না,এটা চিন্তা করতে গিয়েই প্রথমবারের ফোন কলটা কেটে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে আবারও ফোন আসে। সব চিন্তা পেছনে রেখে এবার ফোনটা রিসিভ করেই ফেললো:
-গাধা, কই তুই?
-নিমি, প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দে। আমাদের ফ্রেন্ডশিপটা ভেঙে দিস না। প্লিজ।
-গাধা,আগে বল তুই এখন কই?
-আমি বাসে। চট্রগ্রাম চলে যাচ্ছি।
-মানে?
-আমি চলে যাচ্ছি। আমি তোর বন্ধুত্তের বিশ্বাস নষ্ট করেছি। এই মুখটা তোকে আর দেখাতে চাই না।
-কি বললি তুই? এখনই বাস থেকে নাম। আমি বাসা থেকে বের হচ্ছি। তুই বাস থেকে তাড়াতাড়ি নাম।
-বাস তো ছেড়ে দিয়েছে। এখন মতিঝিলে।
-চলন্ত বাস থেকে লাফ দিয়ে নাম।
নাফিস বুঝতে পারলো,নিমির সেই পরিচিত জেদটা আবারও চেপে গিয়েছে।এখন বাস থেকে না নামা পর্যন্ত আর উপায় নেই।
নাফিস কি করবে বুঝতে পারছিলো না। শেষপর্যন্ত বাসের হেল্পারকে ডাক দিলো:
-মামা, বাস থামান।
-কেন মামা? টয়লেটে যাইবেন? কি যে করেন না আপনারা। ওঠার আগে সব সাইরা উঠতে পারেন না?
-না মামা,টয়লেটে যাবো না। আমি নেমে যাবো। বাস দাড়া করান।
বাসের হেল্পার চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।
-সত্যি যাইবেন না?
-আরে মামা,সত্যি বলতেসি।তাড়াতাড়ি বাস থামান।
বাসের হেল্পার কিছুটা বিরক্ত হয়েই আমাকে বাস থেকে নামিয়ে দিলো।
ঘড়িতে তখন রাত ১০টা বেজে ৩০ মিনিট। বাস থেকে নেমে দাড়িয়ে রইলো নাফিস। নিমি কোথায় আসবে,কীভাবে আসবে কিছুই তো জানালো না। কথাটা চিন্তা করতে করতেই নিমি ফোন দিলো:
-ওই গাধা,বাস থেকে নেমেছিস?
-হ্যাঁ।
-ভেরি গুড। এখন তুমি সুন্দর করে ফুলার রোডে চলে আসো।
-কেন?
-আমি অপেক্ষা করতেসি তাই।
কি হতে চলেছে নাফিস কিছুই বুঝতে পারছে না। যাইহোক,অগত্যা একটা রিকশা ডেকে ফুলার রোডের দিকে যেতে শুরু করলো।

রাত ১১টা বেজে ৩৫ মিনিট: অনেক গল্পের ব্যস্ত ভিড়ে গমগম করতে থাকা ফুলার রোডটা ক্লান্তির ছাপ নিয়ে তখনও জেগে ছিল। সেই ক্লান্ত রোডের মাঝ বরাবর নাফিস দাড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে।
-মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছিস কেন? মাথা তুলে আমার দিকে তাকা।
নিমির কথায় সামনের দিকে তাকালো নাফিস। চোখে একধরণের ভয় খেলা করছে।
-ভালোবাসিস আমাকে?
মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর জানায় নাফিস।
-বলিসনি কেন এতদিন?
-ভয়ে।
-আরে গাধা,যদি ভয়ই পাস,তাহলে ভালোবাসবি কেমন করে? নে,হাতটা ধর।
-মানে?
-তুই না আমার হাতটা সারাজীবন ধরে রাখতে চেয়েছিলি? তাই হাতটা তোকে দিলাম। ধর।
-মানে, আমি এখনও বুঝতে পারছি না।
-ধুর গাধা,হাত ধর। আজকে প্রথমে তুই যখন আমাকে ভালোবাসার কথা বললি,তখন একটু রাগ লাগছিলো। কিন্তু পরে চিন্তা করে দেখলাম,তুই ছাড়া আমাকে আর কেউই এইভাবে ভালবাসতে পারবে না। U r one & only। পরে তোর এক ফ্রেন্ডের কাছ থেকে জানতে পারলাম,তুই আজকের পরীক্ষাটা ড্রপ দিয়ে চলে এসেছিস। কথাটা শুনে অনেক খারাপ লাগছিলো। তুই আমাকে এতো ভালবাসিস,আর তোকে আমি কীভাবে ফিরিয়ে দেই বল?
-সত্যি, আমাকে ভালবাসবি?
-আবার জিগায়। ওই গাধা,কখন থেকে হাত বাড়িয়ে রেখেছি। ধরবি না?
নাফিস আর একমুহূর্তও দেরী না করে হাতটা চেপে ধরে।
-এই হাতটা কখনও ছাড়বি না তো?
-কখনোই না।
কথাটা শুনে নিমি মিষ্টি করে হেসে ওঠে।
-এতো রাতে বের হয়ে আসলি,বাসায় যাবি না?
-নাহ, আজ রাতে তোর সাথে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবো। বাসায় বলেছি,পাশের বাসার ফ্রেন্ডের এখানে আছি। কোন চিন্তাই করবে না।
-তুই তো অনেক চালাক।
-আবার জিগায়। চল তাহলে।
-কোথায়?
-গাধা, রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবো। চল।
নাফিস মিষ্টি করে হেসে ফেলে।
নিমির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল,চল.....................

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top