একটি সস্তা প্রেমকাহিনী
by- আলোহীন রোদ্দুর।
.
"রানী...... দরজা টা লাগা তাড়াতাড়ি!!"
উফফ!! আজকে নির্ঘাত দেরী হয়ে যাবে। এই কাজের মেয়েটাও এত্ত স্লো!!
"শোন। আমি গেলাম। তুই ঘর টা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখিস। বাবুর দিকে খেয়াল রাখিস। খাবার বানিয়ে খাওয়াস আর প্যান্ট চেঞ্জ করে দিস। আর তোর ভাইজান ঘুম থেকে উঠলে বলিস টেবিল এ নাস্তা রাখা আছে। যাতে খেয়ে নেয়। আমি গেলাম।"
চট করে একবার হাতঘড়িটায় সময় দেখল। সর্বনাশ!! আজকে আর রক্ষা নাই!! চট করে আয়না টায় একবার মুখ টা দেখে নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে বের হল।
ধেত্তেরি!! মরার বৃষ্টি!! নামার আর টাইম পেলি না!! ছাতাও আনি নি। আবারও ফিরে এসে কলিং বেল বাজাল। "উফ! দরজা খোলে না কেন! যেদিন দেরি হয় সেদিন সব দিক থেকেই ভেজাল লাগে!"
দুই তিনবার বেল বাজানোর পর দরজা খুলল। "কিরে, এতক্ষণ লাগে দরজা খুলতে!! আমার ছাতা টা নিয়ে আয়।"
রানী ছাতা নিয়ে এলে প্রায় দৌড়ুতে দৌড়ুতে বের হল। নিচে নেমে একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠে বসল। "মামা, একটু তাড়াতাড়ি যান প্লিজ!! আল্লাহ, আজকে জ্যাম এ না পরলেই হয়।"
এই হচ্ছে ইরিনা শায়েক সিমুর প্রতিদিনের সকালের চিত্র। একটা নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের টিচার সে। 'রূপবতী' শব্দ টা যেসব মেয়েদের সাথে যায় তাদের মধ্যে সিমুর অবস্থান প্রথম সারির দিকে। কলেজ, ভার্সিটি তে কতজন যে অর পিছনে ঘুরেছে তার ইয়ত্তা নেই। আর ঘুরবেই বা না কেন!! যার হাসি দেখলে মনে হয় শরতের শুভ্র শিউলি তার সমস্ত স্নিগ্ধতা নিয়ে ফুটে আছে, তার প্রেমে না পড়াটাই অস্বাভাবিক বিষয়! কিন্তু সুন্দরী মেয়েদের চিরাচরিত অহঙ্কার তার মাঝেও ছিল। আর তাই কাউকেই পাত্তা দিত না। শেষ পর্যন্ত মা বাবার পছন্দের ছেলে কেই বিয়ে করে সংসারী হয়েছে আজ প্রায় ২ বছর। স্কুলে জয়েন করার পর অনেকেই খাতির জমানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে সুকৌশলে ট্যাকল করেছে এসব। প্রায় ১ বছর হতে চলল স্কুলে জয়েন করেছে। এরই মাঝে বাচ্চা দের প্রিয় ম্যাম এ পরিণত হয়েছে! আর হবেই বা না কেন!! অর এই মুক্তোঝরা হাসি যে কোন পিচ্চি কে আপন করে নেয়ার জন্য যথেষ্ট! বাচ্চারা তো সিমু ম্যাম বলতে অজ্ঞান! আর ওর ক্লাস গুলো বাচ্চারা এনজয় ও করে অনেক। সচরাচর অন্যান্য দের ক্লাস থেকে অনেক ইন্টারেস্টিং ভাবে পড়ায় ও!

.
রিকশা থেকে নামতে নামতে শুনতে পেল ক্লাস শুরুর ঘন্টা বাজছে! কোনমতে ভাড়া টা দিয়ে দৌড় দিল... তাড়াহুড়া করে টিচার'স রুমে গিয়ে হাজিরা খাতায় সাইন করে বই নিয়ে ছুটল ক্লাসে। যাক!! বেশি লেট হয় নি!
.
"হাই সিমু!!!"
"হাই!!" কলিগ কে একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিল।
আজকে প্রথমেই নার্সারি ওয়ান এর ইংলিশ ক্লাস। ক্লাসে ঢুকল। সাথে সাথে বাচ্চারা চিৎকার করে উঠল "গুড মর্নিং ম্যাম!!"
সাথে সাথে সিমুর মন টা আনন্দে ভরে গেল! সেও মিষ্টি হেসে বাচ্চাদের অভিবাদনের জবাব দিল। এই বাচ্চা গুলোকে দেখলে ওর মন টা আনন্দে ভরে ওঠে। আর এজন্যই ভাল স্যালারির চাকরির অফার পেয়েও যায় নি। এই কদিনেই বাচ্চা গুলোকে অনেক ভালবেসে ফেলেছে।
"তোমরা কেমন আছ সবাই?"
বাচ্চারা একযোগে চিৎকার দিয়ে উঠল, "ভাল আছি ম্যাম!! আপনি কেমন আছেন?"
"আমিও ভাল আছি। তোমরা সবাই বস।"
সবাই বসলে রোল কলের খাতা বের করে রোল কল টা সেরে নিল।
"তোমরা সবাই হোম ওয়ার্ক করেছ?? সবাই হোম ওয়ার্ক জমা দাও।"
হোম ওয়ার্ক নেয়া শেষ হলে বলল, "তাহলে এখন আমরা পড়াশুনা করি একটু?"
"না ম্যাম!! আমরা গল্প শুনতে চাই!"
"অবশ্যই আমরা গল্প শুনব! কিন্তু তার আগে আমাদের একটু পড়াশুনা করা উচিত না? আমরা আগে একটু পড়ব তারপর গল্প শুনব! কেমন?"
"আচ্ছা ম্যাম!! তবে অল্প একটু পড়ব!"
"আচ্ছা, অল্প একটুই পড়াব! তবে আমি যেমন তোমাদের কথা রাখছি তোমাদেরও কিন্তু আমার কথা রাখতে হবে! সবাইকে মনোযোগ দিতে হবে! যদি দুষ্টুমি কর তাহলে কিন্তু আর গল্প শুনাব না!"
"না ম্যাম! আমরা কেউ দুষ্টুমি করব না!"
"ঠিক আছে দেখা যাক!"
পড়ানো শুরু করল। কিছুক্ষন পর দেখল হেডমিস এসে হাজির হলেন। সাথে একটা ফুটফুটে মেয়ে। অসম্ভব মায়াকাড়া চাহনি, ফুলের মত নিষ্পাপ মুখ, দেখলেই গাল টিপে আদর করে দিতে ইচ্ছে করে!
হেডমিস এসে বললেন, "সিমু, এই মেয়ে টা আজকে ভর্তি হয়েছে। তুমি ক্লাসে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিও।"
"আচ্ছা ম্যাম, রেখে যান।"
পড়ানোর মাঝখানে ছিল বলে তখন একটা জায়গায় বসিয়ে দিল। ভাবল যে পড়ানো শেষ করে তারপর পুরো ক্লাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।
পড়ানো শেষ হলে সে ডাক দিল মেয়েটাকে। ভীতসন্ত্রস্ত ভাবে তার কাছে এল মেয়েটা!
"এবার আমি তোমাদের সাথে একজন নতুন বন্ধু কে পরিচয় করিয়ে দিব। "
ক্লাসের সবাই আগ্রহী হয়ে উঠল। সবাই নতুন বন্ধুর সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে!
সিমু মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল, "তোমার নাম কি বাবু?"
জড়তামেশানো মিষ্টি কন্ঠে মেয়েটি উত্তর দিল, "সিমু!"
"সিমু!! আমার নামও তো সিমু!! তুমি তো তাহলে আমার মিতা!!"
মেয়েটা ফিক করে হেসে দিল। অসম্ভব সুন্দর হাসি! বাম গালের টোল টা তাতে আরও মধু ঢেলেছে।
"সবাই শোন, এ হচ্ছে তোমাদের নতুন বন্ধু সিমু। সবাই তাকে স্বাগত জানাও।"
ক্লাসের সবাই হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাল। ক্লাসের সাথে পরিচয় পর্ব শেষে সিমু জিজ্ঞেস করল, "তোমার পুরো নাম কি?"
"ইরিনা শায়েক সিমু!"
এইবার সিমুর স্তম্ভিত হবার পালা!! এটা কিভাবে সম্ভব! এমন না যে তার নাম টা খুব কমন! আচ্ছা, সিমু নামটা না হয় এক হতে পারে কিন্তু একেবারে হুবহু মিল!! এটা কাকতালীয় থেকে বেশি কিছু! শিউর হবার জন্য আরেকবার জিজ্ঞেস করল। একি উত্তর পেয়ে অবাক হয়ে গেল!! নাহ!! এটা সম্ভব না! নিশ্চয় কোন কাহিনী আছে!
সিমু জিজ্ঞেস করল, "তোমার আব্বু কি করেন?"
সাথে সাথে মেয়েটার মুখ টা কাল হয়ে গেল। রাজ্যের অন্ধকার তার পূর্ণিমার চাঁদের মত মুখটায় এসে ভর করল।
সিমু একটু ভয় পেয়ে গেল! কি এমন জিজ্ঞেস করল যে মেয়েটা এত্ত কষ্ট পেল!
"কি করেন তোমার আব্বু??"
"আমার আব্বু দুমাস আগে একটা রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গেছেন। আব্বু সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিল।"
সাথে সাথে সিমু বুঝতে পারল সে মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে! নিজের অজান্তে বাচ্চা মেয়েটার দুখের সাগরটাকে আবারও উথলে দিয়েছে। সে বলল, "থাক মা! মন খারাপ করে না! তুমি যদি মন খারাপ কর তাহলে তোমার আব্বু কষ্ট পাবেন। কি নাম ছিল তোমার আব্বুর?"
"শাহরিয়ার কবির স্নিগ্ধ"
এই উত্তর টা সিমু তার সুদূরতম কল্পনা, দুঃস্বপ্ন কোনটাতেই আশা করে নি!! সাথে সাথে তার মনে পড়ে গেল ৬ বছর আগের কিছু স্মৃতি যা এতদিনে সে প্রায় ভুলতে বসেছিল! এই নাম টা তাকে আবার সব মনে করিয়ে দিল। বড় নির্মম ভাবে মনে করিয়ে দিল!
স্নিগ্ধ ভালবাসত তাকে। একি সাথে পড়ত দুজন ভার্সিটি তে। জুয়েল স্টুডেন্ট ছিল স্নিগ্ধ। একটু পাগলাটে টাইপ! অবশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। লাইব্রেরি তে পরিচয় প্রথম। তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব গাড় হতে লাগল। স্নিগ্ধ দুর্বল হয়ে পড়ল তার প্রতি। একদিন বলেই ফেলল তাকে তার মনের কথা! কিন্তু সিমু এসবে মোটেও আগ্রহী ছিল না। সে স্নিগ্ধ কে বন্ধুর বেশি কিছু ভাবত না। তাই স্নিগ্ধর প্রপোজ পেয়ে সাংঘাতিক রাগ করেছিল।
.
মনে পড়ে সেই বিকেল টার কথা। স্নিগ্ধ কে আচ্ছা মত ঝাড়ল। একটা কথাও বলল না সে! চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে সব শুনল!
সিমুর বলা শেষ হলে বলল, "সিমু, আমি সত্যিই তোমাকে অন্তরের একেবারে গভীর থেকে ভালবেসে ফেলেছি। আমি তোমার জন্য সব করতে পারব। আমি যা না তাই হব। শুধু শুধু তোমার জন্য। একবার শুধু হ্যা বল! প্লিজ!"
.
এসব শুনে সিমুর মেজাজ আরও গরম হয়ে গেল! কঠিন স্বরে বলল, "দেখ স্নিগ্ধ, আমি তোমাকে আমার খুব ভাল একজন বন্ধু ভাবতাম যার সাথে সব শেয়ার করতে পারি। কিন্তু তুমি যে এটাকে ভালবাসা ভেবে বসবে জানলে আমি কোনদিনও সেই সুযোগ টা দিতাম না! আর আমি এসব ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী না।"
.
"প্লিজ সিমু! তুমি ভাব। আরেকটু ভাব! আমি অপেক্ষা করব, যতদিন তুমি চাও!"
"প্লিজ!! এসব বাংলা সিনেমার ডায়লগ আওড়াবা না একদম! এসব সবাই বলে। আমার পক্ষে পসিবল না। তুমি হাজার বার বললেও না। স্যরি।"
.
আর কিছু বলে নি ছেলেটা। শুধু ঝড়ে বিধ্বস্ত বকের মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তারপর শুধু এটুকুই বলেছিল, "ঠিক আছে। আমি আর কোনদিনও তোমাকে জ্বালাব না। তোমার সাথে যোগাযোগ করব না। শুধু এতটুকু বলে যাই, আমার নিদর্শনে তোমার স্মৃতি কে আমি বাঁচিয়ে রাখব।"
.
সিমুর তখন মেজাজ গরম। এসব কথায় কান দেয়ার কোন আগ্রহ বোধ করল না। নিষ্ঠুর ভাবে বলেছিল, "হয়েছে! এসব সিনেমার ডায়লগ রাখ। এরকম কত বলে। বছর খানেক গেলেই সব ভুলে যাবা!"
.
আর কিছু বলে নি স্নিগ্ধ। টলমল পায়ে চলে গিয়েছিল। সেই শেষ কথা এবং দেখা। তারপর সময় বয়ে গেছে তার আপন গতিতে। সিমুও আস্তে আস্তে ভুলে গিয়েছিল সব। কার কাছে শুনেছিল স্নিগ্ধ বিয়ে করেছে।
শুনে নিজের উপর অনেক গর্ব হয়েছিল। মনে মনে বলেছিল, "হুহ! খুব তো বলেছিল আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। এখন তো ঠিক ই বিয়ে করে সংসারী হয়েছে! এসব জানা আছে আমার। আবেগের বশে বলা কথা!
ঘোর কেটে গেছে। এখন সব ভুলেও গেছে!"
.
এরপর কেটে গেছে অনেক দিন। সে নিজেও এর মাঝে বিয়ে করে সংসারী হয়েছে। ভালই চলছিল সব কিছু। স্নিগ্ধর নাম টাও মুছে গিয়েছিল প্রায়! কিন্তু আজ স্মৃতি এক বিদ্যুৎ শিখার মত তার হৃদয় আকাশ টাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে গেছে। স্নিগ্ধ তার কথা রেখেছে! সে বাঁচিয়ে রেখেছে তার স্মৃতি কে!!
আজ সেই স্মৃতি তার অন্ধ একগুয়েমিতার দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি হাসছে! টপ টপ করে অশ্রু ঝরে পরছে তার চোখ থেকে। ঝরুক, আজ এই বৃষ্টির সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাক! তুমি জিতে গেছ স্নিগ্ধ!! আমি বিদ্ধ তোমার ভালবাসার তূণে! হৃদয়ের খেলায় তুমি বিজয়ী।
.
ঘণ্টা বাজছে। এ ঘণ্টা ধ্বনি যেন স্নিগ্ধর বিজয়ের ঘণ্টা ধ্বনি!! ঢং...... ঢং...... ঢং......
by- আলোহীন রোদ্দুর।
.
"রানী...... দরজা টা লাগা তাড়াতাড়ি!!"
উফফ!! আজকে নির্ঘাত দেরী হয়ে যাবে। এই কাজের মেয়েটাও এত্ত স্লো!!
"শোন। আমি গেলাম। তুই ঘর টা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখিস। বাবুর দিকে খেয়াল রাখিস। খাবার বানিয়ে খাওয়াস আর প্যান্ট চেঞ্জ করে দিস। আর তোর ভাইজান ঘুম থেকে উঠলে বলিস টেবিল এ নাস্তা রাখা আছে। যাতে খেয়ে নেয়। আমি গেলাম।"
চট করে একবার হাতঘড়িটায় সময় দেখল। সর্বনাশ!! আজকে আর রক্ষা নাই!! চট করে আয়না টায় একবার মুখ টা দেখে নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে বের হল।
ধেত্তেরি!! মরার বৃষ্টি!! নামার আর টাইম পেলি না!! ছাতাও আনি নি। আবারও ফিরে এসে কলিং বেল বাজাল। "উফ! দরজা খোলে না কেন! যেদিন দেরি হয় সেদিন সব দিক থেকেই ভেজাল লাগে!"
দুই তিনবার বেল বাজানোর পর দরজা খুলল। "কিরে, এতক্ষণ লাগে দরজা খুলতে!! আমার ছাতা টা নিয়ে আয়।"
রানী ছাতা নিয়ে এলে প্রায় দৌড়ুতে দৌড়ুতে বের হল। নিচে নেমে একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠে বসল। "মামা, একটু তাড়াতাড়ি যান প্লিজ!! আল্লাহ, আজকে জ্যাম এ না পরলেই হয়।"
এই হচ্ছে ইরিনা শায়েক সিমুর প্রতিদিনের সকালের চিত্র। একটা নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের টিচার সে। 'রূপবতী' শব্দ টা যেসব মেয়েদের সাথে যায় তাদের মধ্যে সিমুর অবস্থান প্রথম সারির দিকে। কলেজ, ভার্সিটি তে কতজন যে অর পিছনে ঘুরেছে তার ইয়ত্তা নেই। আর ঘুরবেই বা না কেন!! যার হাসি দেখলে মনে হয় শরতের শুভ্র শিউলি তার সমস্ত স্নিগ্ধতা নিয়ে ফুটে আছে, তার প্রেমে না পড়াটাই অস্বাভাবিক বিষয়! কিন্তু সুন্দরী মেয়েদের চিরাচরিত অহঙ্কার তার মাঝেও ছিল। আর তাই কাউকেই পাত্তা দিত না। শেষ পর্যন্ত মা বাবার পছন্দের ছেলে কেই বিয়ে করে সংসারী হয়েছে আজ প্রায় ২ বছর। স্কুলে জয়েন করার পর অনেকেই খাতির জমানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে সুকৌশলে ট্যাকল করেছে এসব। প্রায় ১ বছর হতে চলল স্কুলে জয়েন করেছে। এরই মাঝে বাচ্চা দের প্রিয় ম্যাম এ পরিণত হয়েছে! আর হবেই বা না কেন!! অর এই মুক্তোঝরা হাসি যে কোন পিচ্চি কে আপন করে নেয়ার জন্য যথেষ্ট! বাচ্চারা তো সিমু ম্যাম বলতে অজ্ঞান! আর ওর ক্লাস গুলো বাচ্চারা এনজয় ও করে অনেক। সচরাচর অন্যান্য দের ক্লাস থেকে অনেক ইন্টারেস্টিং ভাবে পড়ায় ও!

.
রিকশা থেকে নামতে নামতে শুনতে পেল ক্লাস শুরুর ঘন্টা বাজছে! কোনমতে ভাড়া টা দিয়ে দৌড় দিল... তাড়াহুড়া করে টিচার'স রুমে গিয়ে হাজিরা খাতায় সাইন করে বই নিয়ে ছুটল ক্লাসে। যাক!! বেশি লেট হয় নি!
.
"হাই সিমু!!!"
"হাই!!" কলিগ কে একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিল।
আজকে প্রথমেই নার্সারি ওয়ান এর ইংলিশ ক্লাস। ক্লাসে ঢুকল। সাথে সাথে বাচ্চারা চিৎকার করে উঠল "গুড মর্নিং ম্যাম!!"
সাথে সাথে সিমুর মন টা আনন্দে ভরে গেল! সেও মিষ্টি হেসে বাচ্চাদের অভিবাদনের জবাব দিল। এই বাচ্চা গুলোকে দেখলে ওর মন টা আনন্দে ভরে ওঠে। আর এজন্যই ভাল স্যালারির চাকরির অফার পেয়েও যায় নি। এই কদিনেই বাচ্চা গুলোকে অনেক ভালবেসে ফেলেছে।
"তোমরা কেমন আছ সবাই?"
বাচ্চারা একযোগে চিৎকার দিয়ে উঠল, "ভাল আছি ম্যাম!! আপনি কেমন আছেন?"
"আমিও ভাল আছি। তোমরা সবাই বস।"
সবাই বসলে রোল কলের খাতা বের করে রোল কল টা সেরে নিল।
"তোমরা সবাই হোম ওয়ার্ক করেছ?? সবাই হোম ওয়ার্ক জমা দাও।"
হোম ওয়ার্ক নেয়া শেষ হলে বলল, "তাহলে এখন আমরা পড়াশুনা করি একটু?"
"না ম্যাম!! আমরা গল্প শুনতে চাই!"
"অবশ্যই আমরা গল্প শুনব! কিন্তু তার আগে আমাদের একটু পড়াশুনা করা উচিত না? আমরা আগে একটু পড়ব তারপর গল্প শুনব! কেমন?"
"আচ্ছা ম্যাম!! তবে অল্প একটু পড়ব!"
"আচ্ছা, অল্প একটুই পড়াব! তবে আমি যেমন তোমাদের কথা রাখছি তোমাদেরও কিন্তু আমার কথা রাখতে হবে! সবাইকে মনোযোগ দিতে হবে! যদি দুষ্টুমি কর তাহলে কিন্তু আর গল্প শুনাব না!"
"না ম্যাম! আমরা কেউ দুষ্টুমি করব না!"
"ঠিক আছে দেখা যাক!"
পড়ানো শুরু করল। কিছুক্ষন পর দেখল হেডমিস এসে হাজির হলেন। সাথে একটা ফুটফুটে মেয়ে। অসম্ভব মায়াকাড়া চাহনি, ফুলের মত নিষ্পাপ মুখ, দেখলেই গাল টিপে আদর করে দিতে ইচ্ছে করে!
হেডমিস এসে বললেন, "সিমু, এই মেয়ে টা আজকে ভর্তি হয়েছে। তুমি ক্লাসে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিও।"
"আচ্ছা ম্যাম, রেখে যান।"
পড়ানোর মাঝখানে ছিল বলে তখন একটা জায়গায় বসিয়ে দিল। ভাবল যে পড়ানো শেষ করে তারপর পুরো ক্লাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।
পড়ানো শেষ হলে সে ডাক দিল মেয়েটাকে। ভীতসন্ত্রস্ত ভাবে তার কাছে এল মেয়েটা!
"এবার আমি তোমাদের সাথে একজন নতুন বন্ধু কে পরিচয় করিয়ে দিব। "
ক্লাসের সবাই আগ্রহী হয়ে উঠল। সবাই নতুন বন্ধুর সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে!
সিমু মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল, "তোমার নাম কি বাবু?"
জড়তামেশানো মিষ্টি কন্ঠে মেয়েটি উত্তর দিল, "সিমু!"
"সিমু!! আমার নামও তো সিমু!! তুমি তো তাহলে আমার মিতা!!"
মেয়েটা ফিক করে হেসে দিল। অসম্ভব সুন্দর হাসি! বাম গালের টোল টা তাতে আরও মধু ঢেলেছে।
"সবাই শোন, এ হচ্ছে তোমাদের নতুন বন্ধু সিমু। সবাই তাকে স্বাগত জানাও।"
ক্লাসের সবাই হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাল। ক্লাসের সাথে পরিচয় পর্ব শেষে সিমু জিজ্ঞেস করল, "তোমার পুরো নাম কি?"
"ইরিনা শায়েক সিমু!"
এইবার সিমুর স্তম্ভিত হবার পালা!! এটা কিভাবে সম্ভব! এমন না যে তার নাম টা খুব কমন! আচ্ছা, সিমু নামটা না হয় এক হতে পারে কিন্তু একেবারে হুবহু মিল!! এটা কাকতালীয় থেকে বেশি কিছু! শিউর হবার জন্য আরেকবার জিজ্ঞেস করল। একি উত্তর পেয়ে অবাক হয়ে গেল!! নাহ!! এটা সম্ভব না! নিশ্চয় কোন কাহিনী আছে!
সিমু জিজ্ঞেস করল, "তোমার আব্বু কি করেন?"
সাথে সাথে মেয়েটার মুখ টা কাল হয়ে গেল। রাজ্যের অন্ধকার তার পূর্ণিমার চাঁদের মত মুখটায় এসে ভর করল।
সিমু একটু ভয় পেয়ে গেল! কি এমন জিজ্ঞেস করল যে মেয়েটা এত্ত কষ্ট পেল!
"কি করেন তোমার আব্বু??"
"আমার আব্বু দুমাস আগে একটা রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গেছেন। আব্বু সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিল।"
সাথে সাথে সিমু বুঝতে পারল সে মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে! নিজের অজান্তে বাচ্চা মেয়েটার দুখের সাগরটাকে আবারও উথলে দিয়েছে। সে বলল, "থাক মা! মন খারাপ করে না! তুমি যদি মন খারাপ কর তাহলে তোমার আব্বু কষ্ট পাবেন। কি নাম ছিল তোমার আব্বুর?"
"শাহরিয়ার কবির স্নিগ্ধ"
এই উত্তর টা সিমু তার সুদূরতম কল্পনা, দুঃস্বপ্ন কোনটাতেই আশা করে নি!! সাথে সাথে তার মনে পড়ে গেল ৬ বছর আগের কিছু স্মৃতি যা এতদিনে সে প্রায় ভুলতে বসেছিল! এই নাম টা তাকে আবার সব মনে করিয়ে দিল। বড় নির্মম ভাবে মনে করিয়ে দিল!
স্নিগ্ধ ভালবাসত তাকে। একি সাথে পড়ত দুজন ভার্সিটি তে। জুয়েল স্টুডেন্ট ছিল স্নিগ্ধ। একটু পাগলাটে টাইপ! অবশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। লাইব্রেরি তে পরিচয় প্রথম। তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব গাড় হতে লাগল। স্নিগ্ধ দুর্বল হয়ে পড়ল তার প্রতি। একদিন বলেই ফেলল তাকে তার মনের কথা! কিন্তু সিমু এসবে মোটেও আগ্রহী ছিল না। সে স্নিগ্ধ কে বন্ধুর বেশি কিছু ভাবত না। তাই স্নিগ্ধর প্রপোজ পেয়ে সাংঘাতিক রাগ করেছিল।
.
মনে পড়ে সেই বিকেল টার কথা। স্নিগ্ধ কে আচ্ছা মত ঝাড়ল। একটা কথাও বলল না সে! চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে সব শুনল!
সিমুর বলা শেষ হলে বলল, "সিমু, আমি সত্যিই তোমাকে অন্তরের একেবারে গভীর থেকে ভালবেসে ফেলেছি। আমি তোমার জন্য সব করতে পারব। আমি যা না তাই হব। শুধু শুধু তোমার জন্য। একবার শুধু হ্যা বল! প্লিজ!"
.
এসব শুনে সিমুর মেজাজ আরও গরম হয়ে গেল! কঠিন স্বরে বলল, "দেখ স্নিগ্ধ, আমি তোমাকে আমার খুব ভাল একজন বন্ধু ভাবতাম যার সাথে সব শেয়ার করতে পারি। কিন্তু তুমি যে এটাকে ভালবাসা ভেবে বসবে জানলে আমি কোনদিনও সেই সুযোগ টা দিতাম না! আর আমি এসব ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী না।"
.
"প্লিজ সিমু! তুমি ভাব। আরেকটু ভাব! আমি অপেক্ষা করব, যতদিন তুমি চাও!"
"প্লিজ!! এসব বাংলা সিনেমার ডায়লগ আওড়াবা না একদম! এসব সবাই বলে। আমার পক্ষে পসিবল না। তুমি হাজার বার বললেও না। স্যরি।"
.
আর কিছু বলে নি ছেলেটা। শুধু ঝড়ে বিধ্বস্ত বকের মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তারপর শুধু এটুকুই বলেছিল, "ঠিক আছে। আমি আর কোনদিনও তোমাকে জ্বালাব না। তোমার সাথে যোগাযোগ করব না। শুধু এতটুকু বলে যাই, আমার নিদর্শনে তোমার স্মৃতি কে আমি বাঁচিয়ে রাখব।"
.
সিমুর তখন মেজাজ গরম। এসব কথায় কান দেয়ার কোন আগ্রহ বোধ করল না। নিষ্ঠুর ভাবে বলেছিল, "হয়েছে! এসব সিনেমার ডায়লগ রাখ। এরকম কত বলে। বছর খানেক গেলেই সব ভুলে যাবা!"
.
আর কিছু বলে নি স্নিগ্ধ। টলমল পায়ে চলে গিয়েছিল। সেই শেষ কথা এবং দেখা। তারপর সময় বয়ে গেছে তার আপন গতিতে। সিমুও আস্তে আস্তে ভুলে গিয়েছিল সব। কার কাছে শুনেছিল স্নিগ্ধ বিয়ে করেছে।
শুনে নিজের উপর অনেক গর্ব হয়েছিল। মনে মনে বলেছিল, "হুহ! খুব তো বলেছিল আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। এখন তো ঠিক ই বিয়ে করে সংসারী হয়েছে! এসব জানা আছে আমার। আবেগের বশে বলা কথা!
ঘোর কেটে গেছে। এখন সব ভুলেও গেছে!"
.
এরপর কেটে গেছে অনেক দিন। সে নিজেও এর মাঝে বিয়ে করে সংসারী হয়েছে। ভালই চলছিল সব কিছু। স্নিগ্ধর নাম টাও মুছে গিয়েছিল প্রায়! কিন্তু আজ স্মৃতি এক বিদ্যুৎ শিখার মত তার হৃদয় আকাশ টাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে গেছে। স্নিগ্ধ তার কথা রেখেছে! সে বাঁচিয়ে রেখেছে তার স্মৃতি কে!!
আজ সেই স্মৃতি তার অন্ধ একগুয়েমিতার দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি হাসছে! টপ টপ করে অশ্রু ঝরে পরছে তার চোখ থেকে। ঝরুক, আজ এই বৃষ্টির সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাক! তুমি জিতে গেছ স্নিগ্ধ!! আমি বিদ্ধ তোমার ভালবাসার তূণে! হৃদয়ের খেলায় তুমি বিজয়ী।
.
ঘণ্টা বাজছে। এ ঘণ্টা ধ্বনি যেন স্নিগ্ধর বিজয়ের ঘণ্টা ধ্বনি!! ঢং...... ঢং...... ঢং......
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন