পালাই
by- Alaxender Abir

.

ঝুম বৃষ্টিতে দাড়িয়ে আছে মেয়েটি। ফোন করেই জরূরী তলব!! নিশ্চয়ই আজ কোন প্যাচ বাধাবে। আমি দৌড়ে গন্তব্যে গেলাম। তার কাধে হাত রাখতেই চমকে উঠলো। তাকে ভালবেসে আমি লাবনী ডাকি আমি। আজও তাই ডাকলাম।
-লাবনী
-চলো
-কোথায়?
-জানিনা..পালাবো
আমি তার কথায় মোটেও চমকে যাইনি। এরকম ফাজলামী ও প্রায়ই করে। মাঝে মাঝে মাঝরাতে ফোনালাপের এক পর্যায়ে ও হুট করে বলে কাল সকালে পালাবো। রেডি থেকো। ওর কাছে পালিয়ে যাওয়াটা একধরনের এডভেঞ্চার মনে হয়। ও বলে,আমরা যদি না পালাই,তাহলে আমাদের নাতি পোত্নিকে কি গল্প শোনাবো? আমি তার কথায় প্রায়ই হাসি।
'ভ্যাবলার মতো চেয়ে আছো কেন? কি বলেছি কথা কানে যায়নি? নাকি আমাকে বিয়ে করবা না!! শুধুই প্রেম করেছো?'-- এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে জোরে একটা নিশ্বাস ফেললো সে।
আমি এবার একটু আশ্চর্য হলাম। আসলেই পালাতে চাইছে? হুম -তার চেহারায় সেই প্রতিচ্ছবিই লক্ষ্য করলাম।
-পালিয়ে কোথায় যাবো?
-জানিনা,তবে আজ পালাবোই। আর ঠিক এক বছর পর আসবো।
-কেন?আসবা কেন?
-এক বছর পর আসলে বাবা মা আমার অভাব বোধ করবে,তখন সব মেনে নিবে।

.

আমি তার কথায় আস্বস্ত হই। তাকে নিয়ে সোজা বাস স্ট্যান্ডে চলে যাই। গন্তব্য আমার বাড়ি। ভেতরে ভেতরে একটা টেনশান কাজ করছিল। কি হয় আল্লাই জানে।

.

.

বাসের ভেতর তার পাশাপাশি সিটে বসে আছি। হুমায়ুন আহমেদের কথাটা মিলে যাচ্ছে,'সুন্দরী
মেয়েদের পাশে থাকলে নিজের চেহারায় গাম্ভীর্য আসে '। আমি সেই কথাটা টের পেলাম হাড়ে হাড়ে।গাম্ভীর্যের ঠেলায় কখন যে বাসে ঘুমিয়ে পড়েছি জানিই না।

.

ঠাস করে বাসের জানালাটা বন্ধ করে দিলো মেয়েটা। চেহারায় এক বিরক্তির ছাপ নিয়ে তার দিকে তাকিয়েছি আমি।
-কি সমস্যা?
-কই নাতো...কোন সমস্যা নাই।
-এত গরমের মধ্যে জানালা বন্ধ করলা কেন?
-তুমি বাসের ভেতর ঘুমাও আগে বলবা না? এটা জানলে এত লং জার্নিতে আসতাম না তোমার সাথে।
-প্রতিটি পুরুষই বাসে ঘুমায়। বলতে পারো এটা পুরুষদের বৈশিষ্ট্য।
-উহু, তোমাকে এটা চেঞ্জ করতে হবে। আমি চাই তুমি অন্য দশ জনের মতো না হও।
-ঘুম পেলে আমি কি করবো?
-আমি ঘুমাতে দিবো না।
-কাজ কি?
-তুমি জেগে থাকবে আর আমি তোমার কাধে মাথা পেতে ঘুমাবো।
-সেটা তো আমি ঘুমালেও পারো।
-উহু,তুমি ঘুমালে আমাকে দেখবে কে?
-হুম তা ঠিক।
-ইশ, আমি শাড়ি পরে আসা উচিত ছিল তাই না?
-কেন?
-এই প্রথম তোমাদের বাসায় যাচ্ছি তো। শাড়ি পরলেই ভালো হতো।
বিশালাকারে হাই তুলে বললাম,'নিজেকে বউ বউ মনে হচ্ছে তাই না?' মিষ্টি হাসি দিয়ে হ্যা সূচক উত্তর দিলো সে।
এবার তার মুখে অস্থিরতার ছাপ,'আচ্ছা তোমার বাড়ি পৌছাতে আর কতক্ষণ লাগবে?' উত্তরে বললাম,'আরো ঘন্টা দুয়েক'।চেহারায় স্পষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছিল তার তর সইছে না। ষাটের উপরে বাস চলছে।তাকে বললাম, 'খোপা করা চুলগুলো খুলে নিতে '। কথাও শুনছে না। খোলা চুলগুলো এখন আমার কপালে এসে লাগতো এই বাতাসে।
উচ্ছলতা নিয়ে বললো,'আচ্ছা আমরা ওখানে যেয়ে কি করবো?' ভ্যাবলার মতো তার দিকে চেয়ে বললাম,'কুড়ে ঘর বানাবো।'
এবার মেয়েটা উত্তেজিত হয়ে বললো,'ওই যে তোমার গল্পের মতো?' ঘাড় নেড়ে তাকে হ্যা বললাম আমি।" এ্যাই শোন,কুড়ে ঘরের পাশে যে পুকুর থাকবে সেখানে এক জোড়া রাজ হাস ও কিন্তু ভেসে থাকতে হবে। আর হাসনাহেনা তো থাকতেই হবে... আর....আর....আর....
আরো অনেক কিছু বলছে গুনগুনিয়ে। মেয়েটা এমনই। সূযোগ পেলেই স্বপ্নবয়ান শুরু করে। বলতে বলতে আমার কাধে মাথা পেতে দিলো। হয়তো বা স্বপ্ন গুলো এখন তার ঘুমের ভেতর ধরা দিবে। দেখুল স্বপ্ন। তার স্বপ্ন বয়ান শুনতে ভালোই লাগে।

.
.

হটাৎ চোখ পড়লো তার চোখের উপর। ঘন ভ্রু,চোখের পাপড়িও অনেক বেশি। এক হওয়াতে আরো বেশি মনে হচ্ছে।আসলেই আমি আর ঘুমাবোনা, আমি ঘুমালে ওর ঘুমন্ত মুখ দেখবে কে? তার ঘুমন্ত মুখ যে মায়ায় ভরা। মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে গভীর ঘুমের দেশে নেয়ার চেষ্টা করছি। গভীর ঘুমে যে গভীর স্বপ্ন দেখবে সে।
অবশেষে সাত ঘন্টার জার্নি শেষে বাড়ি পৌছুলাম আমি। আমার মা কে পা ছুয়ে সালাম করলাম। আম্মু প্রতি বারের মত নেই। উনার চোখ কপালে উঠে গেছে।
-এইটা কে?
আমি চুপ। আম্মু আবারো চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, বলবি তো কে এটা?
আমি কিচ্ছু বললাম না।
আমার পাশে থাকা মেয়েটা আম্মুর পা ছুতে চাইলো। আম্মু সালাম নিলেন।
-তুমি কে?
-আমি ই ই ই......
-বল কে?
পাশে কম্পিউটারে গেম খেলতে ব্যাস্ত আমার ছোট ভাই।তার কন্ঠস্বর ভারি হয়ে উঠলো।
-ভাইয়া,এটা কি সেই লাবনী?
-হ্যা।
আম্মু হতবাক। ছোট ভাই এর মুখে কথাটা শুনে আম্মুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।আম্মু আমাকে জিগেস করলো-
-লাবনী মানে?
-লাবনী মানে লাবনী।
-তুই কি স্পষ্ট কথা বলা ভুলে গেছিস?
-না।
-তাহলে বলছিস না কেন?
-আম্মু ও কে আমার পছন্দ। তাই আদর করে লাবনী ডাকি।
-তো এখানে আনলি কেন?
-ও চলে আসছে। তোমাকে দেখতে চেয়েছিল।
-তোর বয়স কত?
-না মানে, ঊনিশ।
-এই বয়সে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছিস?
-আমার কি দোষ?ও ই তো আসছে।
লাবনী চুপ করে আছে। আম্মুর রক্তচক্ষু দেখে ও কেদেই দিল। আমার ভাই বললো-'ভাইয়া তোর লবনী তো দেখি ছিঁচকাঁদুনী। এই মেয়েকে তোর পছন্দ হলো কেমনে?
আমি চিল্লানি দিয়ে বললাম,'চুপ কর। ও তোর ভাবি।
আম্মুর কান ফাটলো।
-তুই বিয়েও করে ফেললি নাকি?
-এক বার করছি।
-মেয়ের বাবা মা জানে?
-না।
-কি বলেছিস এখানে আসার কথা?
-ওদের কলেজ থেকে পিকনিকে যাচ্ছিল। সেই সুযোগে........
আমার ভাই আবারো বলে,'খুব তো ভাব দেখাস। বাংলা সিনেমা দেখিস না। এখন তো তুই ই সিনেমা বানিয়ে ফেললি।
লাবনী হেসে দিল। আমি আম্মুকে যমদূতের মত ভয় পাই। সেই আমিও হেসে দিলাম। উঠোনে মুরগী তাড়ানোর ছড়ি ছিল। আম্মু সেটার মাঝখানে ভেঙেই আমার পিঠে চড়ালো। ছোট কালে ক্রিকেট খেলতে গেলে এই ভাবেই মারতো। আর আমি বলতাম -'ও আম্মু, আর করবো না। এই শেষ।' আজ ও বলে দিলাম 'ও আম্মু আর করবো না বিয়ে, এটাই শেষ। '
আমার কথা শুনে হাসির রোল পড়ে গেল সবার মাঝে। আম্মু আর মারতে পারলো না। লাবনীর দিকে তাকিয়ে বলে-
-তোমার কি বিবেক বুদ্ধি নাই?এভাবে কেউ অন্যের বাড়ি আসে?
-আমাকে ও বলেছে।
-কি বলেছে?
-আপনাদের বাড়িতে ছোট্ট একটা পুকুর আছে। সান বাধানো।পুকুরে নাকি দুটো রাজ হাস গলা উচিয়ে সারা দিন সাতার কাটে। একটা ছোট্ট বাগান আছে। কিছু হাস মুরগী আছে। আর কিছু কবুতর আছে।
-বাহ!! সাহিত্যিকের মতো বর্ণণা দেয় আমার ছেলে।
-আরো বলেছে।
-কি কি?
-আমার নাকি ছোট্ট একটা দেবর আছে। ভালো একজন শ্বাশুড়ি আছে।
ওর কথা শুনে আম্মু মুচকি হেসে দিল।সতীন মানে আমার নানুও হেসে দিল। খালি মাড়ি দেখিয়ে হাসছে। দাত নেই তো।
-তোমার নাম কি?
-(নাম বললো)
-বেশ সুন্দর নাম তো।
-আমি কি আরেক বার সালাম করতে পারি?
-বোকা মেয়ে, এটা জিগেস করা লাগে?
-আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছে মা?
-সব কি বলতে হয় মেয়ে?বোঝনা?
লাবনী সালাম করলো আম্মুকে আর নানুকে। আমার ছোট ভাই হা করে তাকিয়ে আছে। ও কেদে দিল।
-মানবো না। ভাইয়া বড় হয়েছে দেখে সব সুবিধা ওর?সারাজীবন সব কিছু আগে পায়। ফোন, ল্যাপটপ সব আমার আগে পেয়েছে। এখন বউ ও আমার আগে পেয়েছে। যাই হউক ভাবি, আমি তোমাকে ললনা ভাবি নামে ডাকবো।
ছিঁচকাঁদুনী মেয়েটাও হেসে দিল। আম্মু ও হাসছে। আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে পিঠ ডলছি। আম্মুর ছড়ির বাড়িটা একটু জোরেই লেগেছে। লাবনীর সামনে কাদলে প্রেস্টিজ পাংচার। কাদতেও পারছি না।

.
....

এত সহজে সবাই মেনে নিবে ভেবে উঠতে পারিনি। যেই পুকুর পাড় দেখার জন্য তার এতদূর আসা, গভীর রাতে সে পুকুর পাড়ে তার পাশে বসে আছি আমি। বললাম-
-ইচ্ছে তো পূরণ হলো?
-হুম
-এখন সমস্যা অন্য জায়গায়
-কি?
-কেউ যদি জিগেস করে তোমার বর কি করে? তখন কি উত্তর দিতে হবে জানো?
-কি?
-ব এ কার বে ক আকার কা র, এক কথায় বেকার।
-মোটেও না
-তাহলে?
-উত্তর হবে 'আমাকে ভালোবাসে '...
তার এ কথার পর আমি একদম চুপ হয়ে গেলাম। বুকের বাম পাশে এ উত্তর টা বিধেছে খুব। কেমন জানি নাড়া দিয়ে গেলো। বলতে ইচ্ছে হচ্ছে,'কে গো তুমি,স্বপ্নভূমি, বানিয়ে দিলে হৃদয়টাকে?...."

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top