অনুভূতির ডায়েরী
By- Accidentable Zubair


না এভাবে আর চলতে পারে না। শুভ কি ভাবে নিজেকে! এত বেশি চুপচাপ থাকলে কি করে হয়! সারাদিন আমি বকবক করেই যাই আর উনি শুধু হু হু করে। আমার সাথে একটু বেশি কথা বললে সমস্যাটা কোথায়! যদি গম্ভীরভাবেই থাকতে হয় তবে আমাকে বিয়ে করার দরকার কি ছিল! না করলেই পারত। ও তো জানেই আমি বেশি কথা বলি। আজকে যে আমাদের বিয়ের একবছর পূর্ণ হয়ে পার হতে চলল কিন্তু উনার এখনও কোন পাত্তা নেই। আর কত রাত করবে ও! সারাদিন অফিস করে কিইবা করে কে জানে! - এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অর্পিতার মনে পড়ে গতকালের কথা। ফজরের নামাযের পর শুভ একটা পুরোনো ডায়েরীতে কি যেন করছিল, পড়ছিল নাকি লিখছিল সেটা বুঝার আগেই শুভ ডায়েরীটা বন্ধ করে অন্য কিসব কাজে মন দেয়। সেই ডায়েরীটা অর্পিতা আগে দেখে নি। অর্পিতার মনে কৌতুহল জাগে কি আছে ঐ ডায়েরীতে যে শুভ মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। এখন কোনো কাজ নেই তাই খুঁজে দেখা দরকার। ওয়ার্ড্রোপের একেবারেই কোণার মধ্যে পাওয়া যায় ডায়েরীটা। অর্পিতা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগে।

.

প্রথমেই দেখা যায় শুভর কলেজ লাইফের ইউনিফর্ম পড়া একটা ছবি। মনে হচ্ছে কেউ যেন চুরি করে ছবিটা তুলেছে। আবার এটাও বুঝা যাচ্ছে যে ছবির পাশে আরেকটা ছবি ছিল। ঠিক নিচে লিখা- "অনুভূতির ডায়েরী"। লিখাটি দেখে অর্পিতার মনে আরও কৌতুহল জাগে। ভাবে, অনুভূতি! শুভ অনুভূতির কি বুঝে! অনুভূতির এক ছটাক পরিমাণও থাকলে আমাকে এখন মন খারাপ করে বসে থাকতে হত না। ডায়েরীর ভিতরে চলে যায় অর্পিতা।কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়া মনে হচ্ছে। তা নিয়ে মাথা ঘামাই না অর্পিতা। ডায়েরীর লিখাই শুরু করেছে নিজের নাম দিয়ে।

.

আমি আতিক ইসলাম শুভ। ডায়েরী লিখার অভ্যাস ছোট বেলা থেকেই। কিন্তু সেভাবে হয়ে উঠে নি নিজের সব কাহিনী ডায়েরীতে সীমাবদ্ধ করা। কিন্তু এবার করব। নিজের জন্যই করব। একেকটা মুহূর্ত মনে রাখতে চাই আমি। কলেজ লাইফে অনেক কিছুই ঘটে আমাদের জীবনে। নতুন কিছু বন্ধু, আবার একেবারে কাছের কিছু বন্ধু এমনকি প্রেম-ও। তিন টাইপের মানুষই ছিল কলেজ লাইফে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি নিজের ভালবাসাকে, প্রথম ভালবাসাকে। প্রথম ভালবাসা এমনই হয়। অনুভূতি বেশি থাকে; কষ্টও বেশি থাকে; আবার ছোট ছোট সুখ অনেক বেশ হাসি খুশিতে রাখে। এমনটাই হয়েছিল আমার সাথে। মেয়েটা ছিল অধরা।- এসব লিখা দেখে অর্পিতার মন খারাপ হয়; এইজন্যই কি শুভ আমাকে তেমন কেয়ার করে না। এখনও কি আছে অধরার প্রতি শুভর ভালবাসা! অর্পিতা পড়তে থাকে।

.

অধরার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় ব্যবহারিক ক্লাসে। আমি, অধরা, বকুল, চন্দন, লাবণী, মিতা, রাজু একই গ্রুপে ছিলাম। অধরার প্রতি তেমন কোন ফিলিংস তৈরী হয়েছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে কি কারণে যেন ভাল লাগত। একজন বন্ধু হিসেবে অধরার তুলনা হয় না। খুব বেশি খেয়াল রাখত। আমি, বকুল, মিতা থাকতাম মেসে। আমার আর বকুলের মেস থেকে মিতার মেসের দূরত্ব ছিল তিন-চার মিনিটের। আমরা তিন জনই গ্রাম থেকে শহরে এসেছি। যেসব দিন খুব সকালে ক্লাস টেস্ট থাকত সেসব দিনে মেসের মিল মানে খাবার খেয়ে যেতে পারতাম না। অধরা খাবার নিয়ে আসত আমাদের জন্য। হয়ত ভাল বন্ধু হয়ে যাওয়ার কারণে একসাথে সময়ও কাটাতাম আমরা। বেশিরভাগ সময়ে নদীর তীরে। বাতাসটা খুব ভাল লাগত। আমার সব দুশ্চিন্তা মুক্ত করে দিত। এই যেমন, আমার বাবা অসুস্থ, ছোট একটা বোন আছে, মা কোন মতে জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালাচ্ছে, আমার পড়াশুনার জন্য টাকা ধার নিচ্ছে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে। আমার এসব চিন্তা মাথায় আসলেই খুব জোরে কান্না করতে ইচ্ছা করত। অনেকবার বাবা-মাকে বলেছি এত কষ্ট করে পড়াশুনা করার চেয়ে কৃষি কাজ করি। কিন্তু উনারা মানেন নি। পড়াশুনা চালিয়ে যেতেই হবে, এটাই ছিল উনাদের আদেশ। মনটা এসব চিন্তা নিয়ে খারাপ করলেই অধরা কেন যেন বুঝতে পারত। আমাকে নিয়ে যেত নদীর তীরে।

.

কলেজের বেশিরভাগ ব্যবহারিক অধরাকে দিয়েই করিয়ে নিয়েছি। আমরা শুধু পাশে দাড়িয়ে থাকতাম আর সব মানগুলো খাতায় টুকে রাখতাম। আমি অবশ্য বেশিরভাগ সময় অধরার দিকে তাকিয়ে থাকতাম, অধরা মাঝে মাঝে বলে উঠত, হাবলার মত তাকিয়ে আছিস ক্যান? জীবনে মেয়ে দেখিস নি?' তখন অন্য কোন অজুহাত দিয়ে কথা কাটিয়ে দিতাম। আর ক্লাসে আরও চুপিচুপি আড় চোখে তাকিয়ে দেখতাম। কলেজের বিভিন্ন সময়ের কথা আমার এখনও মনে আছে। কিন্তু সেগুলো ডায়েরীতে না লিখাই ভাল হবে। যেমন, বকুল আর মিতার প্রেম কাহিনী। এই কাহিনীতে কোন জটিলতা নেই। একেবারে সোজা-সাপ্টা। কিন্তু আমার আর অধরার কাহিনী ছিল ভিন্ন; অনেক ভিন্ন।
কলেজ জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চলে গেলাম। অধরা, মিতা, বকুল এক বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আমি অন্য আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন মন লাগাতে না পারলেও পরে মন লাগাতে পেরেছিলাম। কিন্তু অধরার জন্য মনটা কেমন করত। যার কোন ডাক্তারী ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। মোবাইলে আমাদের যোগাযোগ ভালই হত। যার কথাবার্তা বন্ধুত্ব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। অধরাকে কখনও বলতে পারি নি কতটা ভালবাসি ওকে। সব কিছু চিন্তা করে দেথতে গেলে আমি ওদের পরিবারের কাছে কিছুই না। সেজন্য নিজেকে বড় কিছু পরিণত করতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম যাতে অধরার পরিবারের সামনে যেয়ে আমার অধরাকে নিজের করে নিতে পারি।

.

দ্বিতীয় বর্ষে অধরার বাবা মারা যায়। সে সময়েই অধরার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল আমার। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছিল; কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। নিজেকে সামলাতে ওর বেশ কয়েকদিন সময় লেগেছিল। তারপর চলতে থাকে অধরা, ওর ভাই জনি আর ওর মায়ের সংসার। দেখতে দেখতে একবছর কেটে যায়। তখন আমি তৃতীয় বর্ষে। একদিন হুট করে বকুল আসে আমার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। আমি তো বকুলকে দেখে পুরো হতবাক! এত দূরে, বকুল! ও কেন এখানে! নিশ্চয় বেড়াতে এসেছে। নয়ত মিতার সাথে কোন বিষয়ে ঝামেলা হইছে। বকুলের মুখে শুকনা হাসি। আমি তো বকুলের সাথে ফাজলামি শুরু করেই দিয়েছি। বকুল তখন হুট করেই ব্যাগ থেকে একটা গিফ্ট বের করে দেয় আর বলে যে অধরা পাঠিয়েছে। আমি সাথে সাথে খুলে দেখি। সেই কাগজে মোড়ানো ছিল আজকের এই ডায়েরী। আর একটি চিঠি। অর্পিতা সেই পৃষ্ঠাতে অার কিছু দেখতে পায় না। পরের পৃষ্ঠায় চলে যায় অর্পিতা। সেখানে আটকানো ছিল একটা চিঠি। অর্পিতা মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকে সেই চিঠি।

.
.

‘শুভ, যখন তুমি এই চিঠি পড়ছ তখন আমি কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে। বাবা মারা যাবার পর আমার বিয়েটা হঠাৎ করে হয়ে যায়। ছেলে আমেরিকা থাকে। আমিও এখন ওখানেই। বিয়ের ব্যাপারটা আমি বন্ধু-বান্ধবীদের কাউকেই জানাই নি। তুমি কি জান আমি তোমাকে কতটা ভালবেসেছি সেই কলেজ জীবন থেকে। তোমাকে ছাড়া জীবনটা অনেক শূণ্য শূণ্য লাগত। তোমার এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা, আড় চোখে চুপিচুপি আমাকে দেখা, একসাথে নদীর তীরে বসে বাতাস খাওয়া, তোমার ব্যবহারিক খাতায় ছবি আঁকিয়ে দেওয়া সবই ভাল লাগত। এই ডায়েরীটা সেই কলেজে থাকতেই কিনেছিলাম। জানতাম, তুমি আগে নিজের অনুভূতিগুলো লেখালেখি করতে। আর নাম দিয়েছি, অনুভূতির ডায়েরী। ছবিটাও চুপ করে তোলা। তোমার ছবির পাশে আমার ছবি লাগিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর রাখি নি। ডায়েরীতে কিছু লিখেওছিলাম। কিন্তু সেগুলো আর তোমাকে দেখাতে পারব না বলে ছিড়ে ফেলেছি। আমি জানি তুমিও আমাকে ভালবাস। কিন্তু তোমার পরিবারের চিন্তার কারণে তুমি আমাকে এখন গ্রহণ করতে পারবে না। আমি তোমার সামনে যেয়ে তোমার কষ্ট বাড়াতে চাই নি। কিন্তু নিজের অনুভূতিগুলো না বলেও যেতে পারছিলাম না। আমার চেয়েও ভাল মেয়ে আসবে তোমার জীবনে; যে আমার মত লুকিয়ে তোমার জীবন থেকে চলে যাবে না। ভাল থাক। সুখে থাক।’
লেখাগুলো দেখার পর অর্পিতার বুঝতে বাকি রইল না শুভ এমন ব্যবহার কেন করে! নিজেকে সামলে নিয়ে অর্পিতা ডায়েরীর সামনের পাতার দিকে এগিয়ে যায়। বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠার পর অর্পিতা কিছু লিখা দেখে। শুভ একান্ত আপনভাবে লিখেছে সেগুলো। যেগুলোতে অর্পিতার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পেয়েছে আর আছে কিছু অনুভূতি। যেখানে কথাগুলো শুরু হয়েছে অনেকটা এভাবে, "অধরা, তুমি চলে যাবার পর ভেবেছিলাম কখনও অন্য কাউকে ভালবাসতে পারব না। বিয়েও করব না। কিন্তু পরিবারের চাপে বিয়ে করলেও ভেবেছিলাম কখনও তোমার জায়গা তাকে দিব না। তারপরেও কি থেকে যে কি হয়ে গেল। অর্পিতা আমার মায়ের বান্ধবীর মেয়ে। বছর দুই আগে অর্পিতার মা ক্যান্সারে মারা যাবার আগে আমার মা উনাকে কথা দিয়েছিল যে অর্পিতার দায়িত্ব আমাদের পরিবারের। মেয়েটিকে আমার মায়ের খুব পছন্দ হয়েছিল। মেয়েটিও অনেক ভাল। আমাকে যে কতটা আপন করে নিয়েছে তা বুঝাতে পারব না। অনেক ভালবাসে আমায়। খেয়াল রাখে সব কিছুর। আমাকে বুঝতেও পারে। কখনও ভাবি নি এমন একটা মেয়ে আমার জীবনে পরিবর্তন এনে দিবে। আমার এমন গম্ভীরতার কারণে ও অনেক কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু এমন আর হবে না। আমি আর কষ্ট দিতে পারব না ওকে। রাখব না ওকে আর অন্ধকারে। সরি অধরা। সরি।"

.

চোখ দিয়ে টিপটিপ করে বৃষ্টির মত পানি ঝরছে অর্পিতার চোখ দিয়ে। কথাগুলো এখন ওকে ভাবাচ্ছে। তাহলে কি সত্যি শুভ এখন শুধু অর্পিতার নাকি শুভ অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করেছে শুধুই মায়ার ছলে। শুভকে এ বিষয়ে কিছুই বলবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

.

কলিংবেল বেজে উঠে। অর্পিতা ভাবনার সাগর হতে মুক্ত হয়। দরজা খুলে অর্পিতা শুভর হাসি মুখটা দেখতে পায়। এক হাতে ফুলের তোড়া আর আরেক হাতে কি যেন একটা উপহার। শুভ বলে, 'চল, আজ বাইরে থেকে খেয়ে আসি।'
পরদিন সেই অনুভূতির ডায়েরীটি ডাস্টবিনে দেখা যায়। দুর্বিসহ কোন অতীতকে মনে রাখতে চায় না শুভ। আর অর্পিতাও এ বিষয়ে কোনদিন কোন কথা বলতে চায় না। বরং নিজের ভালবাসার পরিমাণটা আরও বাড়িয়ে তুলতে থাকে।

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top